অন্যায় কেন ঘটে—ইসলামী দৃষ্টিতে আল্লাহর ইচ্ছা, মানুষের স্বাধীনতা ও পরীক্ষার বাস্তবতা।
“যদি আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও সর্বজ্ঞ হন, তাহলে পৃথিবীতে এত অন্যায় কেন?”—এ প্রশ্ন যুগে যুগে বহু মানুষের মনে এসেছে। ইসলামী আকিদায় এর উত্তর বুঝতে হলে আগে আল্লাহর ইচ্ছা (মাশিয়াত) সম্পর্কে একটি মৌলিক বিষয় জানা প্রয়োজন।
ইরাদাহ কাওনিয়্যাহ: যা আল্লাহ নির্ধারণ করলে অবশ্যই সংঘটিত হবে: ইরাদাহ কাওনিয়্যাহ বলতে এমন বিষয়কে বোঝানো হয়, যা আল্লাহর ফয়সালা অনুযায়ী অবশ্যম্ভাবীভাবে ঘটবে। এগুলো মানুষের ইচ্ছা বা সামর্থ্যের বাইরে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫)
একইভাবে সূর্য ও চন্দ্রের নির্ধারিত গতিপথ কিংবা কিয়ামতের আগমনও আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালার অন্তর্ভুক্ত। মানুষ চাইলেও এগুলো পরিবর্তন বা প্রতিরোধ করতে পারে না।
ইরাদাহ শরইয়্যাহ: যা আল্লাহ ভালোবাসেন ও নির্দেশ দেন: অন্যদিকে ইরাদাহ শরইয়্যাহ হলো সেই বিষয়গুলো, যা আল্লাহ পছন্দ করেন এবং বান্দাদের জন্য বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যেমন—ঈমান, সালাত, রোজা, সত্যবাদিতা, ন্যায়বিচার, দান-সদকা এবং পিতা-মাতার প্রতি আনুগত্য।
আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরি পছন্দ করেন না।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:৭)
অর্থাৎ কোনো কিছু পৃথিবীতে ঘটছে বলেই তা আল্লাহর প্রিয় বা পছন্দনীয়—এমন ধারণা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যায় ঘটতে দেওয়া আর অন্যায়কে সমর্থন করা এক নয়: ইসলামী দৃষ্টিতে আল্লাহ চুরি, ব্যভিচার, হত্যা, শিরক কিংবা জুলুমকে বৈধ বা পছন্দনীয় করেননি। বরং কোরআনে এসবের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
চুরি সম্পর্কে বলা হয়েছে, “চোর পুরুষ ও চোর নারী—তাদের হাত কেটে দাও।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩৮)
ব্যভিচার সম্পর্কে নির্দেশ এসেছে, “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩২)
হত্যা সম্পর্কে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩২)
আর শিরক সম্পর্কে কোরআনের ভাষ্য, “নিশ্চয়ই শিরক হলো মহা জুলুম।” (সূরা লুকমান, ৩১:১৩)
অতএব, ইসলামী ব্যাখ্যায় এসব অপরাধ সংঘটিত হওয়া আল্লাহর অনুমোদনের প্রমাণ নয়; বরং মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও দায়িত্বের বাস্তবতার অংশ।
দুনিয়া কেন পরীক্ষার স্থান: কোরআন ঘোষণা করে, “যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম।” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:২)
আরও বলা হয়েছে, “আমি মানুষকে পথ দেখিয়েছি; এরপর সে হয় কৃতজ্ঞ হবে, নয়তো অকৃতজ্ঞ হবে।” (সূরা আল-ইনসান, ৭৬:৩)
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, মানুষকে যদি কোনো ভুল করার সুযোগই না দেওয়া হতো, তাহলে পরীক্ষা, নৈতিক দায়িত্ব, পুরস্কার কিংবা শাস্তির ধারণা অর্থহীন হয়ে যেত। মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাই পরীক্ষার ভিত্তি।
কেন সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি আসে না: অনেকেই প্রশ্ন করেন, অন্যায় ঘটার আগেই আল্লাহ তা প্রতিহত করেন না কেন?
কোরআনে বলা হয়েছে, “মানুষ তাদের জুলুমের কারণে যদি আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে পাকড়াও করতেন, তবে পৃথিবীতে কোনো প্রাণীকেই অবশিষ্ট রাখতেন না। কিন্তু তিনি তাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অবকাশ দেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৬১)
ইসলামী ব্যাখ্যায় এই অবকাশকে তওবা, সংশোধন ও সত্যের পথে ফিরে আসার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। তাৎক্ষণিক শাস্তি নয়, বরং জবাবদিহির জন্য সময় দেওয়া আল্লাহর হিকমতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ক্ষমতা দেওয়া মানেই অন্যায়ের দায় নেওয়া নয়: একটি সাধারণ উদাহরণ বিষয়টি সহজে ব্যাখ্যা করতে পারে। বিদ্যুৎ দিয়ে যেমন হাসপাতালের জীবনরক্ষাকারী যন্ত্র চালানো যায়, তেমনি অপব্যবহার করে অপরাধও করা যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সেই অপরাধের নৈতিক দায় বহন করে না; দায় বহন করে অপরাধী।
একইভাবে ইসলামী দৃষ্টিতে আল্লাহ মানুষকে হাত, চোখ, বুদ্ধি, শক্তি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। সেই ক্ষমতা ন্যায়ের পথে ব্যবহার করা বা অন্যায়ের পথে অপব্যবহার করা মানুষের নিজস্ব দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয়।
উপসংহার: ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা এমন বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে যা অবশ্যম্ভাবীভাবে ঘটবে—যেমন জন্ম, মৃত্যু, রিজিক ও কিয়ামত। আর বিধানগত ইচ্ছা হলো সেই পথ, যা তিনি মানুষের জন্য পছন্দ করেছেন—ঈমান, নেক আমল, সত্য ও ন্যায়বিচারের পথ।
চুরি, খুন, ধর্ষণ, শিরক কিংবা জুলুম ইসলামে কখনোই আল্লাহর প্রিয় বা নির্দেশিত কাজ হিসেবে বিবেচিত নয়। বরং তিনি এসব স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং মানুষকে সঠিক ও ভুলের মধ্যে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়ে পরীক্ষা করছেন।
কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল।” (সূরা আশ-শুরা, ৪২:৩০)
আরও বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো জুলুম করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করে।” (সূরা ইউনুস, ১০:৪৪)
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী আকিদা মনে করে, অন্যায়ের অস্তিত্ব আল্লাহর ন্যায়বিচারের অস্বীকৃতি নয়; বরং এটি এমন এক পরীক্ষার অংশ, যার চূড়ান্ত বিচার হবে আখিরাতে, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার কর্মের পূর্ণ হিসাবের সম্মুখীন হবে।
মতামত দিন