আন্তর্জাতিক
ছবি: সংগৃহীত

আল-আকসা বন্ধ, ওল্ড সিটির বাইরে ঈদের নামাজে মুসল্লিরা।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

ঈদের সকালেও স্বাভাবিক চিত্র দেখা গেল না জেরুজালেমে। মুসল্লিদের পদচারণায় মুখর থাকার কথা থাকলেও পুরোনো শহরের (ওল্ড সিটি) প্রবেশপথেই থেমে যায় তাদের যাত্রা।

ইসরায়েলি পুলিশের বাধার মুখে শত শত মানুষ মসজিদে ঢুকতে না পেরে বাইরে খোলা জায়গাতেই ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ রমজানের শেষদিকে এসে আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণ পুরোপুরি বন্ধ রাখে। ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। এর আগেই ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ধাপে ধাপে মুসল্লিদের প্রবেশ সীমিত করা হয়, যা ঈদের সময় এসে পুরো নিষেধাজ্ঞায় রূপ নেয়।

কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটকে সামনে আনা হয়। তবে ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এটি কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং হারাম আল-শরিফ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ জোরদারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ। একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত সপ্তম শতাব্দীর ডোম অব দ্য রক মুসলিমদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা।

স্থানীয় বাসিন্দা হাজেন বুলবুলের ভাষায়, এই পরিস্থিতি শুধু একটি দিনের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সংকেত। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে জেরুজালেমে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ আরও বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুরোনো শহরে ফিলিস্তিনি মুসল্লি ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার বাড়ার অভিযোগও উঠেছে। একইসঙ্গে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। নামাজ চলাকালেও অভিযান চালিয়ে আটক করার ঘটনাও সামনে এসেছে।

ঈদের আগে যে পুরোনো শহর সাধারণত জমজমাট থাকে, এবার সেখানে নেমে আসে অস্বাভাবিক নীরবতা। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়, খোলা ছিল শুধু ওষুধ ও জরুরি পণ্যের দোকান। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এদিকে, আল-আকসার খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ একরিমা সাবরি মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে নির্দেশনা দেন, মসজিদের যতটা সম্ভব কাছাকাছি গিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করতে। তবে এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা, তল্লাশি ও বাধার কারণে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের শঙ্কা বাড়ছে।

এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আরব লীগ। সংস্থাটি একে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। পাশাপাশি ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা, আরব লীগ ও আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশন যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার ও উপাসনার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।

বিবৃতিতে আরও সতর্ক করা হয়, এই ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে এবং সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে, গাজায় চলমান সংকটের মধ্যেই ঈদ উদযাপন করছেন বাসিন্দারা। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকটের কারণে উৎসবের আমেজ অনেকটাই ম্লান। দেইর আল-বালাহে আশ্রয় নেওয়া সাদিকা ওমর জানান, স্বজন হারানো আর ঘরবাড়ি ধ্বংসের মাঝেও মানুষ ধর্মীয় অনুশাসন মেনে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

খান ইউনিসের বাসিন্দা আলা আল-ফাররার কথায়, প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে সময়। হঠাৎ বিমান হামলার আশঙ্কা তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষ সীমিত সামর্থ্যে ঈদের খাবার তৈরির চেষ্টা করছে। তবে বাজারের অধিকাংশ পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় উৎসবের আনন্দ অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

মতামত দিন