যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজির বড় ক্রেতা হচ্ছে কাতার, বছরে কিনবে ৭০ লাখ টন।
একসময় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিকারক দেশ ছিল কাতার। কিন্তু ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এবার উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই বিপুল পরিমাণ গ্যাস কিনতে যাচ্ছে দেশটি।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের চেনিয়ার ও উডসাইড এনার্জির কাছ থেকে বছরে মোট ৭০ লাখ টন এলএনজি কিনবে কাতার। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজির অন্যতম বড় ক্রেতা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে দেশটি।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় উৎপাদিত গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জি সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হচ্ছে। হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানির মাধ্যমে বিকল্প উৎস নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক ছিল কাতার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এ দশকের শুরুতে কাতারকে পেছনে ফেলে বিশ্বের শীর্ষ রপ্তানিকারকের অবস্থান নেয়। কিন্তু চলমান সংঘাত কাতারের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন এনেছে। মার্চে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি স্থাপনাগুলো মেরামতের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে কাতার এনার্জি।
চুক্তি পালনে পাঁচ বছর পর্যন্ত ছাড়
উৎপাদন ও পরিবহন সংকটের কারণে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ফোর্স মেজর ঘোষণা করেছে কাতার এনার্জি। যুদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিশেষ পরিস্থিতিতে চুক্তির বাধ্যবাধকতা পালন করতে না পারলে কোনো প্রতিষ্ঠান যে আইনি সুবিধা নিতে পারে, সেটিই ফোর্স মেজর।
গত সপ্তাহে এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে গ্যাস সরবরাহসংক্রান্ত ফোর্স মেজরের মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাতারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাইপলাইনেও মিলছে না বিকল্প
হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে পাইপলাইন ব্যবহারের সম্ভাবনাও আপাতত নাকচ করেছে কাতার। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ও কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, এলএনজি পরিবহনের ক্ষেত্রে পাইপলাইনকে সরাসরি বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
নিউইয়র্কে কাতার ইকোনমিক ফোরামের এক বিশেষ অধিবেশনে তিনি বলেন, পাইপলাইনে গ্যাস পাঠাতে হলে গন্তব্যস্থলে পুনরায় তরলীকরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিদ্যমান নর্থ ফিল্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পের সঙ্গে নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিও যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে এ উদ্যোগ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়।
তবে হরমুজ প্রণালি আবার উন্মুক্ত হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে ফেরার প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন আল-কাবি।
বিকল্প পথে সরবরাহের চেষ্টা
সংকট মোকাবিলায় কাতার এখন বিকল্প পরিবহনপথেও এলএনজি সরবরাহের চেষ্টা করছে। আল-কাবির ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু চালান ইরান হয়ে পাকিস্তানের দিকে যাচ্ছে। আবার কিছু চালান যুক্তরাষ্ট্রের পথ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এখনো সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচল করতে পারছে।
জ্বালানি খাতের এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। নিজস্ব উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পরিবহনপথের অনিশ্চয়তায় কাতারকে এখন আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
সূত্র: অয়েলপ্রাইস
মতামত দিন