তাহসিফের মৃত্যুতে নতুন মোড়, তুরাগপাড়ে মিলল নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল।
তুরাগ নদে সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে একটি নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
গত বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের একটি বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় পিবিআই। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না।
অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামালও জানিয়েছেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর তদন্তে নতুন তথ্য মিলেছে।
তবে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে অন্যান্য আলামত মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তাঁর দাবি, ঘটনার দিন তাঁরা দুজন তুরাগ নদীর পাড়ে বসে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। আর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান।
মোটরসাইকেলটির বিষয়ে পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানিয়েছেন, নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে এটি পাওয়া গেছে। নম্বরপ্লেট না থাকায় মালিকানা যাচাই করা হচ্ছে। এর আগে সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফকে নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হতে দেখা গিয়েছিল।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। তাহসিফের বাসার নিরাপত্তাকর্মীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে দীপের সঙ্গে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে দীপ একাই ফিরে আসেন। নিরাপত্তাকর্মীর দাবি, ফেরার সময় দীপের আচরণও স্বাভাবিক মনে হয়নি। তিনি চোখাচোখি এড়িয়ে কথা বলছিলেন এবং মিটিমিটি হাসছিলেন।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ফোন পাওয়ার পর বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মায়ের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে তিনি বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর তাঁর সঙ্গে পরিবারের আর যোগাযোগ হয়নি।
এদিকে, নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তে যুক্ত হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাঁদের কথা বলতে ও হাত মেলাতে দেখা যায়। পরে দুজনকে আলাদা মোটরসাইকেলে করে চলে যেতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ফুটেজের ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
পরিবারকে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তাঁরা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে মেরামতের কাজ শেষে খাবার খেয়ে দুজন আলাদা হয়ে যান।
এর পরদিন, ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টঙ্গীর রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় একটি মরদেহ উদ্ধার করে নদী পুলিশ। হাতে থাকা ঘড়ি ও পকেটে পাওয়া আইফোনের সূত্র ধরে সেটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করা হয়। ২৯ অক্টোবর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। এর আগে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের সন্দেহ, ছেলেকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ঘটনায় দীপের কোনো সংশ্লিষ্টতা এখনো প্রমাণিত নয়। মোটরসাইকেলের মালিকানা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে মৃত্যুর প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চালাচ্ছে পিবিআই।
মতামত দিন