ট্রাম্পের শুল্কচাপে বিকল্প বাণিজ্যপথ খুঁজছে কানাডা-ইইউ, মন্ট্রিলে গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা কমাতে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে চাইছে কানাডা। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার মন্ট্রিলে বৈঠকে বসছে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের আলোচনায় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের পাশাপাশি নীতিগত সমন্বয় ও নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
কানাডাকে ইইউর প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার ধারণাটিও আলোচনায় রয়েছে। গত মাসে ফন ডার লিয়েন এ সম্ভাবনার কথা বললেও ইইউর বিদ্যমান চুক্তিতে এমন সদস্যপদের বিধান নেই। কয়েকটি সদস্যদেশের আপত্তিতে সম্মেলনের যৌথ বিবৃতির খসড়া থেকে ‘সহযোগী সদস্য’ শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বুধবার মন্ট্রিলে পৌঁছে ফন ডার লিয়েন জানান, এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করার উপায় নিয়ে দুই পক্ষ কথা বলবে।
কার্নির মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অনিশ্চিত ও বিভক্ত হয়ে পড়ছে। তাই কানাডা ও ইউরোপকে নিজেদের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তিনি নতুন ও উচ্চাভিলাষী অংশীদারত্ব গড়ার কথা বললেও এর সাফল্য কোনো আনুষ্ঠানিক নামের পরিবর্তে কানাডার মানুষের জীবনে কী সুফল বয়ে আনে, সেটিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
এই উদ্যোগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাব রয়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আরোপিত শুল্ক কানাডার অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে চাপে ফেলেছে। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে তাঁর বারবার দেওয়া বক্তব্যও দেশটিতে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নও মার্কিন শুল্কের মুখে পড়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ফন ডার লিয়েন বলেছেন, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার সময়ে ইইউ বিশ্বস্ত অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। তাঁর মতে, কানাডার সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের স্বাভাবিক পদক্ষেপ।
বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। তবে সেটির পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো বাকি। মার্কিন শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায় কানাডার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপে নতুন বাজার খুঁজছে। মন্ট্রিলের বৈঠকে ডিজিটাল বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণাও আসতে পারে, যার লক্ষ্য হবে অনলাইন লেনদেন আরও দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল করা।
প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতেও সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। যৌথ বিবৃতির প্রাথমিক খসড়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে বিধিবিধান নিয়ে সমন্বয়ের কথা ছিল। জলবায়ু ও জ্বালানি নীতিতেও দুই পক্ষের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করাও আলোচনার বড় বিষয়। ব্যাটারি ও বায়ুকল তৈরিতে ব্যবহৃত এসব খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে কানাডায়। বিপরীতে, এ ধরনের উপকরণের জন্য ইউরোপের চীনের ওপর নির্ভরতা বেশি। কানাডা থেকে সরবরাহ বাড়লে ইউরোপের জন্য বিকল্প উৎস তৈরির সুযোগ হবে। তবে কানাডার খনিজ উত্তোলন খাত সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
শিক্ষা খাতেও সমঝোতার উদ্যোগ চলছে। কানাডার শিক্ষার্থীরা যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইরাসমাস’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন, সে বিষয়ে অটোয়া ও ব্রাসেলস কাজ করছে। এ কর্মসূচির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পড়াশোনার সুযোগ পান।
এএফপির তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত অংশীদারত্বের আওতায় কানাডার জন্য ইইউর কিছু কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ এবং দুই পক্ষের মধ্যে অভিন্ন শাসনকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে। তবে সদস্যপদের ধারণা, বাণিজ্যিক সমঝোতা ও অন্যান্য সহযোগিতার চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণে আরও আলোচনা প্রয়োজন।
সূত্র: এএফপি

মতামত দিন