নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইসরায়েলের নির্বাচনে কঠিন লড়াই।
দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ঘিরে অসন্তোষ, যুদ্ধের পরিণতি এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার জবাবদিহি—এসব প্রশ্ন সামনে রেখেই ভোট দিচ্ছেন ইসরায়েলিরা। মঙ্গলবারের সাধারণ নির্বাচনে ফলাফল যেদিকেই যাক, নতুন সরকার গঠনে জোটের হিসাব-নিকাশ বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচনের ফল নির্ধারণে অনিশ্চিত ভোটারদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ভিটারবি ফ্যামিলি সেন্টারের এক সমীক্ষায় প্রায় ১৩ শতাংশ ভোটার তখনো সিদ্ধান্ত নেননি বলে উঠে এসেছে। বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকোটের পাশাপাশি ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের অবস্থানও নির্বাচনী হিসাবকে প্রভাবিত করছে। আরব সংখ্যালঘু ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং আরব দলগুলোর সম্ভাব্য সমর্থনও সরকার গঠনের সমীকরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় ভোট শুরু হয়েছে, চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ৭৩ লাখ; তাঁদের মধ্যে ৩ লাখ ৩০ হাজারের মতো ভোটার এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিচ্ছেন।
নেতানিয়াহুর বিরোধীদের প্রচারণার কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতার প্রশ্ন। ওই হামলায় ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয়। হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জিম্মিদের সবাইকে ফিরিয়ে আনতে না পারা এবং যুদ্ধ শেষ করার সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার অভিযোগেও নেতানিয়াহু সরকারের ওপর চাপ রয়েছে।
বিরোধী দলগুলো ক্ষমতায় এলে নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে জাতীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির মামলাও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে রেখেছে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু প্রচারণায় নিজের যুদ্ধকালীন নেতৃত্বকে সামনে এনেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছেন ট্রাম্প। রোববার নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরানের হুমকি দূর করতে ট্রাম্প আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত, তবে তাঁকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।
আইজেনকোট অবশ্য নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভয় দেখানো, মিথ্যা বলা ও হুমকি দিয়ে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্পের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, জনগণের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি পূর্ণ সহযোগিতা করবেন। ৭ অক্টোবরের হামলার পর আইজেনকোট যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন; পরে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করে আট মাস পর পদত্যাগ করেন।
সরকার গঠনের পর নেতানিয়াহুকে আবারও কট্টর ডানপন্থি নেতা ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানির অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে জনমত জরিপে বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টির সমর্থন বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের কিরিয়াত আরবা বসতিতে ভোট দিয়ে বেন-গভির বলেছেন, নেতানিয়াহুই আবার প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তাঁর দল সরকারে ডানপন্থি শক্তি হিসেবে থাকবে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতও ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে। ২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলের ১২ দিনের বিমান হামলা এবং এ বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বাড়িয়েছে। লেবাননের সঙ্গে সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান চাপও ভোটারদের বিবেচনায় রয়েছে।
বিভিন্ন মেয়াদে মোট ১৯ বছর ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। তবে জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এল মনে করেন, এবারের নির্বাচনে দুই শিবিরের ব্যবধান খুব সামান্য হতে পারে এবং কোনো পক্ষের একচ্ছত্র জয় পাওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রয়োজনীয় আসন না পেলে সরকার গঠনে দীর্ঘ দর-কষাকষি চলতে পারে; সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
মতামত দিন