জ্বালানি সংকটে ইউরোপে ক্ষোভ, বাড়ছে কট্টর ডানপন্থীদের সমর্থন।
ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয়। গ্যাস-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্যপণ্যের বাড়তি দাম ও আবাসনসংকট ঘিরে জনঅসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক দেশে।
ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ইউরোপের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হয়েছে। গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় ১৪০ শতাংশ, আর ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের সঙ্গে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও বাসাভাড়ার চাপ যুক্ত হয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপ থেকে রাজনৈতিক মেরুকরণ
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ শুধু একটি বা দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে কম মজুরি ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। স্পেনে এক বৃদ্ধাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা আবাসনসংকট নিয়ে দেশব্যাপী ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে। আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইতালির মিলানে সরকারি সেবার মান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং দোকান লুটের ঘটনা ঘটে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে কৃষকেরা জ্বালানির বাড়তি খরচের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন। ট্রাকচালক, কৃষক ও ইস্পাতশ্রমিকদের সড়ক অবরোধে কয়েকটি এলাকায় পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ ও দোকানে পণ্য পৌঁছানো নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক গিলস ইভালদির মতে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে জ্বালানির দাম ঘিরে নির্বাচনী লড়াই
আগামী বছরের এপ্রিলে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালির নেতা মারিন ল্য পেন জ্বালানির ওপর মূল্য সংযোজন কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোও জ্বালানির দাম কমানোর বিষয়টিকে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
গ্রাম ও আধা-শহর এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে জ্বালানির ব্যয় বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই অসন্তোষ ল্য পেনের সমর্থন বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জরিপ অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে, বিপরীতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর জনপ্রিয়তা কমেছে।
এদিকে ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় বড় ধরনের অস্থিরতায় রূপ নেয়। মাখোঁ বিক্ষোভকারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে যৌক্তিক বললেও প্রতিবাদের দাবির সঙ্গে সহিংসতা ও ভাঙচুরকে এক করে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য ফেরানোর দাবি
জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য পুনরায় চালুর প্রশ্নও ইউরোপের রাজনীতিতে জায়গা করে নিচ্ছে।
জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) জাতীয় জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফলের পর দলটির অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। সেপ্টেম্বরে দেশটির মূল্যস্ফীতি প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
এএফডি রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য পুনরায় চালুর পক্ষে। দলটির দাবি, ইউক্রেনকে সমর্থন দিতে গিয়ে জার্মানি নিজের অর্থনীতি ও জ্বালানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি করছে।
মিউনিখের কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ান স্টেকেল বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় জ্বালানির উচ্চমূল্যের সঙ্গে এএফডির প্রতি ভোটারদের সমর্থন বৃদ্ধির সম্পর্ক দেখা গেছে। তাঁর মতে, জনতুষ্টিবাদী দলগুলো বাড়তি জ্বালানি ব্যয়কে সরকারের নীতির ফল হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক কারণের প্রভাব ব্যাখ্যা করা তুলনামূলক কঠিন।
ইতালিতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা রবার্তো ভান্নাচ্চির নেতৃত্বাধীন নতুন কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল ফিউচারও রাশিয়ার সঙ্গে গ্যাস বাণিজ্য পুনরায় চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির দলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে দলটি।
পোল্যান্ডে কট্টর ডানপন্থী দল কনফেডারেশন অব দ্য পলিশ ক্রাউনের সমর্থন বাড়ার পেছনেও জ্বালানি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ ভূমিকা রাখছে। দলটির নেতা গ্রজেগর্জ ব্রাউন রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা আবার শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মানির লুবমিনে এএফডির রাজনীতিকদের সঙ্গে একই অবস্থানের পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি।
জ্বালানির দাম, আবাসন ব্যয় ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এসব ইস্যু রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারের কেন্দ্রে চলে এসেছে। আগামী বছরের নির্বাচনগুলোতে অর্থনৈতিক অসন্তোষ ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।
সূত্র: রয়টার্স

মতামত দিন