আন্তর্জাতিক
ছবি: সংগৃহীত

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, এবার জানা গেল নেপথ্যের কাহিনী।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় ভিডিও ধারণ ও প্রচারের অভিযোগে এক পাকিস্তানি নাগরিককে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

কয়েক মাস আগে সৌদি আরবের আদালতে এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলে। সম্প্রতি সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে তথ্য প্রকাশের পর ঘটনাটি আলোচনায় এসেছে।

ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন সৌদি আরবে কর্মরত দুই বাংলাদেশি আলেমের সূত্রে পাওয়া বিবরণ। তাঁদের একজন মাওলানা নাজমুস সাগরিম। তিনি মক্কা ও মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের ইমাম ও খতিবদের খুতবা বাংলায় অনুবাদের কাজে নিয়োজিত। অন্যজন কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল।

বিবরণ অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে একটি আপিল আদালতে দোভাষী হিসেবে তাঁদের ডাকা হয়। আদালতে উপস্থিত হয়ে তাঁরা দেখতে পান, এক বাংলাদেশি পুরুষ ও এক নারীকে বিচারিক কার্যক্রমের জন্য হাজির করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বাংলায় দেওয়া বক্তব্য আরবিতে বিচারককে বুঝিয়ে বলা এবং বিচারকের প্রশ্ন বাংলায় অনুবাদ করে তাঁদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন ওই দুই আলেম।

আদালতে উপস্থিত থাকার সুবাদে তাঁরা মামলার শুনানি ও বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারেন। তাঁদের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত পুরুষের নাম নজরুল ইসলাম। তাঁর বয়স আনুমানিক ১৮ থেকে ১৯ বছর। অপর অভিযুক্ত নারী সুইটি আক্তার। নেকাব ও মাস্কে মুখ ঢাকা থাকায় তাঁদের বয়স ও চেহারা স্পষ্টভাবে বোঝা কঠিন ছিল বলে বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে।

যেভাবে কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায় ভিডিও

ঘটনার সূত্রপাত মক্কার একটি মসজিদে। সেখানে প্রকাশ্যে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা হয়। বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনাটি দূর থেকে এক পাকিস্তানি নাগরিক ভিডিও করেন।

ভিডিও ধারণের পর তিনি সরাসরি সৌদি পুলিশের কাছে পাঠাননি। বরং অভিযুক্তদের সতর্ক করা এবং এ ধরনের কাজ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে অন্য একজনের কাছে ভিডিওটি পাঠান বলে জানা গেছে। এরপর একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সেটি সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায়।

ভিডিওটি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর অভিযুক্তদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের আদালতে হাজির করা হয় এবং শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম।

তিন মাসে কয়েক দফা শুনানি

প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, মামলাটির শুনানি প্রায় তিন মাস ধরে কয়েক দফায় চলে। দীর্ঘ শুনানি ও পর্যবেক্ষণ শেষে একাধিক বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল দুই বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সঙ্গে ভিডিও ধারণ ও প্রচারের ঘটনায় জড়িত পাকিস্তানি নাগরিককে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে ওই বিবরণে দাবি করা হয়েছে।

রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশি কান্নাকাটি করে বিচারকদের কাছে অনুনয়-বিনয় করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের এমন অবস্থায় দেখে আদালতে উপস্থিত বাংলাদেশি আলেমদেরও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে। এ সময় একজন প্রবীণ বিচারক তাঁদের উচ্চতর আদালতে আপিল করার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলেও বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

সম্প্রতি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, সাজা কার্যকরের সুনির্দিষ্ট সময় এবং আপিলের পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এই বিবরণে পাওয়া যায়নি।

আইন ও অপরাধ নিয়ে আলোচনার প্রশ্ন

মসজিদের মতো পবিত্র স্থানে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তবে ঘটনাটি ঘিরে আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—সৌদি আরবে এ ধরনের অপরাধের অভিযোগে শুধু প্রবাসীরাই বিচারের মুখোমুখি হন, নাকি দেশটির নাগরিকদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়?

অপরাধের বিচার, শাস্তির প্রয়োগ এবং নাগরিক ও প্রবাসীদের ক্ষেত্রে আইনের সমান প্রয়োগ নিয়ে এ ঘটনা নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।

মতামত দিন