ব্যবসায়-বাণিজ্য
ছবি: সংগৃহীত

ব্যবসা নেই, তবু শেয়ারের দাম বাড়ছে, ঝুঁকিতে বিনিয়োগকারীরা।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

দেশের পুঁজিবাজারে এমন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ছে, যাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনাবেচা চলছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়ছে দামও।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৭টি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরেই বন্ধ হয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। সর্বশেষ এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস।

দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়ায় বাজারে এসব লেনদেনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, মৌলভিত্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন দরবৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

ডিএসইর তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ সাল থেকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৬টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। এর সঙ্গে ২০০২ সাল থেকে বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজকে যুক্ত করলে বর্তমানে অকার্যকর কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৭টি। অর্থাৎ, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।

চলতি বছর কার্যক্রম বন্ধ হওয়া পাঁচটি কোম্পানি হলো অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, ফু-ওয়াং ফুড ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম যথাক্রমে ২৫ জুন, ৯ জুলাই, ১ আগস্ট, ২২ আগস্ট ও ৪ অক্টোবর বন্ধ হয়।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফু-ওয়াং ফুড ২০০০ সালের জুলাইয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস তালিকাভুক্ত হয় ২০০৬ সালে, অ্যাকটিভ ফাইন কেমিক্যালস ২০১০ সালে, এএফসি অ্যাগ্রো বায়োটেক ২০১৪ সালে এবং সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস ২০১৫ সালে। অর্থাৎ, চলতি বছর বন্ধ হওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠানের চারটিই অন্তত এক দশক ধরে পুঁজিবাজারে ছিল।

কেন বন্ধ হচ্ছে একের পর এক কোম্পানি?

বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে নানা ধরনের সমস্যা। কোথাও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিরোধ, কোথাও আর্থিক অনিয়ম ও ঋণসংক্রান্ত জটিলতা, আবার কোথাও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাসসংকট ও কাঁচামালের অভাব প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংকটে ফেলেছে।

এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস চলতি বছরের আগস্টে উৎপাদন বন্ধ করে। ব্যাংকিং বিধিনিষেধ, কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যা ও দক্ষ শ্রমিকের সংকটকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল কোম্পানিটি। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিক দেশ ছাড়েন। পরে ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ায় উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে সমস্যা দেখা দেয়।

অন্যদিকে, হামিদ ফেব্রিকস গত বছরের জুনে কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় দুই বছর ধরে চলা গ্যাসসংকট পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটালে শেষ পর্যন্ত কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

অ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ২২০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। রানি মার্কা ঢেউটিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে বন্ধ। তালিকাভুক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালকদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছিল।

বন্ধ কোম্পানির শেয়ারে দরবৃদ্ধি কেন?

ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দাম সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এতে এসব শেয়ারের লেনদেনের পেছনে জল্পনা বা সম্ভাব্য কারসাজি রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত বছরের মে মাস থেকে বন্ধ থাকা আজিজ পাইপসের শেয়ারের দাম গত এক মাসে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৯৯ টাকা ৩০ পয়সায় পৌঁছেছে। এ সময়ে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ২৬ টাকা ৩০ পয়সা। গত মঙ্গলবার এক দিনেই দাম বেড়েছে ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

২০০২ সাল থেকে কার্যক্রম বন্ধ থাকা মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দামও গত এক মাসে ২০ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৭১ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ছয় বছরের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের শেয়ারের দাম বেড়েছে ২২ শতাংশ। আর ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে উৎপাদন বন্ধ থাকা শ্যামপুর সুগার মিলসের শেয়ারের দাম বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও আয় বন্ধ, সেসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ার পেছনে প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার প্রতিফলন না-ও থাকতে পারে। ফলে এসব শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে কোম্পানির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না পেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

নজরদারি বাড়াল ডিএসই

কোম্পানিগুলোর প্রকৃত অবস্থা যাচাই করতে সরেজমিন পরিদর্শন বাড়িয়েছে ডিএসই। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানিয়েছেন, অনেক কোম্পানি তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রকৃত অবস্থা সময়মতো বিনিয়োগকারীদের জানায়নি। এ কারণে সরাসরি পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে শুধু পরিদর্শনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও স্টক এক্সচেঞ্জকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।

যেসব কোম্পানির পুনরায় ব্যবসা শুরুর বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা জমা দেওয়ার পাশাপাশি অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। আর যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর, সেগুলোর আর্থিক ও আইনি অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পৃথক সমাধানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

লেনদেন স্থগিতের পরিকল্পনা

দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা কোম্পানিগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মাসুদ খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেন স্থগিত করার পরিকল্পনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে সিদ্ধান্তটি কবে থেকে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি।

এদিকে, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসের মতো কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে পুনরায় উৎপাদন শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। ২০১৫ সালে আইপিওর মাধ্যমে ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করা প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ২০১৭ সালের জুনে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সালে আলিফ গ্রুপ কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ২০২২ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলেও ডিএসইর সর্বশেষ পরিদর্শনে কারখানাটি আবার বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হওয়া প্রান্তিকের পর কোম্পানিটি আর কোনো প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। নির্ধারিত সময়ে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘জেড’ শ্রেণিতে নামিয়ে দেয় ডিএসই। আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় অনুমোদনপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি।

সব মিলিয়ে, তালিকাভুক্ত কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং একই সঙ্গে তাদের শেয়ারের দাম বাড়ার ঘটনা পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারী সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে। বন্ধ কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ, প্রকৃত তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করা এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

মতামত দিন