হুতি হামলার শঙ্কায় আড়ালে সৌদি যুবরাজ, ফুরাচ্ছে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেপণাস্ত্র।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ঘিরে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় তাঁকে বাংকার-সুবিধাযুক্ত একাধিক রাজপ্রাসাদে রাখা হচ্ছে।
যুবরাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে গিয়ে প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমছে। এ পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এদিকে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান হুতি হামলার জবাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেবে কি না, তা বিবেচনা করা হচ্ছে। রিয়াদের অন্যান্য মিত্রও দেশটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
এই নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার সেখানে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। গত এক দশকে সৌদি আরবে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি হিসেবে ঘটনাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুতি বিদ্রোহীদের এক মুখপাত্র বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে আরও হামলার হুমকি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, গত পাঁচ দিনে কিং খালিদ বিমানবন্দরে চার দফা হামলা চালানো হয়েছে। সপ্তাহান্তের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এ কারণে নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে যুবরাজের প্রকাশ্য উপস্থিতিও সীমিত হয়ে পড়েছে। গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নিরাপত্তায় বিশেষভাবে নির্বাচিত একটি দক্ষ দল কাজ করছে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার বর্তমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বৈরিতা। ২০১৫ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দেশটির সরকারের পক্ষে সৌদি আরব সামরিক হস্তক্ষেপ করলে দুই পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয়। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও তা ছিল নড়বড়ে।
গত জুলাইয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর থেকে ইরানের একটি উড়োজাহাজ তেহরানের উদ্দেশে উড্ডয়নের চেষ্টা করলে সৌদি বাহিনী গুলি চালায় বলে অভিযোগ করে হুতিরা। এরপর থেকেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে আরব উপদ্বীপে সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে তেহরানও। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের বক্তব্য, এ উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে ইসরায়েল সরকার।
কূটনৈতিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও চলছে। গত রোববার রাতে সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ফোনে কথা বলেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রিয়াদকে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের পথে এগোনোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে তেহরান সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
তবে একদিকে বিমানবন্দরে হামলা, অন্যদিকে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসার তথ্য—সব মিলিয়ে সৌদি আরবের সামনে নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখার চাপ বাড়ছে।
মতামত দিন