যে ভূমিতে বাইতুল্লাহ, যে মাটিতে শুয়ে আছেন প্রিয় নবী (সা.)—সেই সৌদি আরবের আকাশে কেন বারবার হামলা?
বিশেষ সম্পাদকীয় | লাইভ নিউজ
সম্পাদকীয় স্ক্রিপ্ট | ১২ অক্টোবর ২০২৬ | আনুমানিক পাঠকাল ১২–১৫ মিনিট
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
সম্মানিত পাঠক, আজকের এই বিশেষ সম্পাদকীয়তে আমরা এমন একটি দেশ নিয়ে কথা বলতে চাই, যে দেশকে পৃথিবীর আর দশটি দেশের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে বিচার করা অন্তত একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের হৃদয়ের জন্য সহজ নয়।
দেশটির নাম সৌদি আরব।
এটি সেই ভূখণ্ড, যেখানে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করেছিলেন তাঁর সর্বশেষ নবী, বিশ্বমানবতার রহমত, হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে।
এটি সেই পবিত্র ভূমি, যেখানে অবস্থিত মুসলিম উম্মাহর কিবলা, পবিত্র কাবা শরিফ। যে কাবার দিকে মুখ করে পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন।
এটি সেই দেশ, যেখানে রয়েছে মসজিদুল হারাম, যেখানে অবস্থিত মসজিদে নববী, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারক। যে মদিনার মাটিতে আজও শায়িত আছেন অসংখ্য সাহাবায়ে কেরাম, ইসলামের প্রথম যুগের মহান ব্যক্তিত্ব এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারের অনেক সদস্য।
এই ভূমি শুধু একটি রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ ভূখণ্ড নয়। মুসলিম উম্মাহর কাছে এটি ইতিহাস, বিশ্বাস, ভালোবাসা, ত্যাগ এবং আধ্যাত্মিক আবেগের এক অনন্য কেন্দ্র।
আর ঠিক এই সময়ে, যখন সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে একের পর এক হামলার খবর আসছে, যখন সেখানে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, তখন একজন মুসলমানের হৃদয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—যে দেশে আল্লাহর ঘর, যে দেশে প্রিয় নবীর স্মৃতিবিজড়িত মাটি, সেই দেশের আকাশে কেন বারবার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাবে? কেন সেই দেশের বিমানবন্দরে নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরবে?
সম্মানিত পাঠক, ১০ অক্টোবর শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলার খবর প্রকাশিত হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার কথা জানানো হয়। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশিও ছিলেন। পরবর্তী প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা ১৩ জনে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়েছে।-Al Jazeera
এর মাত্র এক দিন পর, রোববার আবারও বিমানবন্দরটির টার্মিনাল এলাকায় আঘাত হানে একটি প্রজেক্টাইল। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন এই ঘটনায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হয়েছেন।-Reuters
ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন রিয়াদে হামলার দায় স্বীকার করেছে এবং দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ আরও কিছু স্থাপনায় হামলার দাবিও করেছে। এসব ঘটনার পর বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে।-Financial Times
কিন্তু আমরা আজ শুধু একটি হামলার পরিসংখ্যান নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমরা কথা বলতে চাই এমন এক দায়িত্ব নিয়ে, যা শুধু সৌদি আরবের রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে নয়, বিশ্বের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
প্রথম প্রশ্ন: হারামাইন শরিফাইনের রক্ষণাবেক্ষণ কি সাধারণ কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব?
সম্মানিত পাঠক, একবার চিন্তা করুন। প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসলমানরা ছুটে যান মক্কা ও মদিনায়। কেউ জীবনের সমস্ত সঞ্চয় জমিয়ে হজ করতে যান। কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন একটি ওমরাহ পালনের আশায়।
কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে যান পবিত্র কাবা দেখাতে। কেউ মদিনায় গিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করার স্বপ্ন দেখেন।তাদের কাছে এই সফর কেবল বিদেশভ্রমণ নয়।এটি ঈমানের টান। এটি হৃদয়ের আকুতি। এটি এমন এক ইবাদতের সফর, যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে গভীর আবেগ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ৯৭ নম্বর আয়াতে সামর্থ্যবান মানুষের ওপর বাইতুল্লাহর হজ ফরজ হওয়ার কথা বলেছেন। আবার সুরা আল-হাজ্জের ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শনকে অন্তরের তাকওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
এই পবিত্র স্থানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, হাজিদের যাতায়াত, চিকিৎসা, আবাসন ও অন্যান্য সেবার বিরাট প্রশাসনিক দায়িত্ব বর্তমানে সৌদি রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত।মক্কার মসজিদুল হারাম, মদিনার মসজিদে নববী এবং ঐতিহাসিক মসজিদে কুবা—সবই সৌদি আরবের ভূখণ্ডে অবস্থিত।
সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় মসজিদে নববীতে নামাজ আদায়ের বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে। একইভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে মসজিদে কুবায় গিয়ে নামাজ আদায় করতেন বলেও সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।-Sunnah
এই পবিত্র স্থানগুলোর দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করা তাই নিঃসন্দেহে এক বিরাট আমানত।
একজন বিশ্বাসী মানুষ একে আল্লাহর হিকমতের আলোকে দেখতে পারেন। এই দায়িত্ব পালনের সুযোগকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিরাট নিয়ামত এবং পরীক্ষা বলেও বিবেচনা করতে পারেন।
হারামাইন শরিফাইনের সেবা করার মর্যাদা যত বড়, সেই সেবার আমানত রক্ষার দায়িত্বও তত বড়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: সৌদি রাজপরিবারের সমালোচনা আর পবিত্র ভূমির প্রতি অসম্মান কি একই বিষয়?
এখানে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য তুলে ধরতে চাই।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রপরিচালনা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক অভিযান কিংবা রাজপরিবারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মতভিন্নতা রয়েছে। কেউ তাদের সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। কেউ সমালোচনা করেন। কেউ মনে করেন সৌদি নেতৃত্ব মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। আবার কেউ মনে করেন, তাদের কিছু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন।
এই মতভিন্নতা থাকতেই পারে।কিন্তু সৌদি আরবের কোনো সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ থাকা আর মক্কা-মদিনার পবিত্রতার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা এক বিষয় নয়। একটি রাষ্ট্রের শাসক পরিবর্তন হতে পারেন। সরকারের নীতি পরিবর্তন হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণও পরিবর্তিত হতে পারে।কিন্তু পবিত্র কাবার মর্যাদা কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মুসলমানের ভালোবাসা কোনো রাজপরিবারের সঙ্গে রাজনৈতিক মতৈক্যের শর্তে আবদ্ধ নয়।
অতএব সৌদি সরকারের নীতির সমালোচনা করা মানেই ইসলামবিরোধিতা নয়। আবার সৌদি সরকারের সঙ্গে বিরোধের কারণে দেশটির নিরীহ মানুষ, ধর্মীয় স্থাপনা কিংবা বেসামরিক বিমানবন্দরকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানোও গ্রহণযোগ্য নয়।এখানে ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষাই আমাদের পথ দেখায়।
পবিত্র কুরআনের সুরা আল-মায়িদার ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন মানুষকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে।
তৃতীয় প্রশ্ন: বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলার শিকার আসলে কারা?
সম্মানিত পাঠক, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৃশ্য কল্পনা করুন। সেখানে হয়তো একজন বৃদ্ধ বাবা অপেক্ষা করছেন তাঁর ছেলের জন্য। কোনো মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোনো বাংলাদেশি প্রবাসী দীর্ঘদিন পর পরিবারের কাছে ফিরবেন বলে বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।কেউ ব্যবসার কাজে যাচ্ছেন। কেউ চিকিৎসার উদ্দেশ্যে। কেউ হজ বা ওমরাহর সফরে। এমন একটি স্থানে যখন বিস্ফোরণ ঘটে, তখন সেই বিস্ফোরণ কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আর সামরিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।তার প্রভাব পড়ে মানুষের জীবনে। একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হয়তো আর ঘরে ফিরতে পারেন না। কোনো শিশু হারিয়ে ফেলে তার বাবাকে। কোনো মা হারিয়ে ফেলেন সন্তানকে।
রিয়াদের সাম্প্রতিক হামলায় নিহত এক ভারতীয় নাগরিক তাঁর পরিবারের সঙ্গে ওমরাহ সফরে ছিলেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বিমানবন্দরে অপেক্ষার সময় হামলার শিকার হন তিনি।-The Indian Express
একবার ভেবে দেখুন, যে মানুষটি আল্লাহর ঘর দেখার নিয়ত নিয়ে সফরে বেরিয়েছিলেন, তাঁর পরিবারের জীবনে কী গভীর বিপর্যয় নেমে এসেছে। এমন মৃত্যুর খবর শুধু একটি জাতির নয়, সমগ্র মানবতার জন্য বেদনাদায়ক।
আমরা এখানে একটি মৌলিক নীতি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ইসলামে নিরপরাধ মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান। সুরা আল-মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে অন্যায়ভাবে একটি প্রাণ হত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।
যুদ্ধের মধ্যেও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো পক্ষের সামরিক উদ্দেশ্য থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা কিংবা নির্বিচারে আঘাত হানা নৈতিক ও আইনগতভাবে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
চতুর্থ প্রশ্ন: ইয়েমেনের সংঘাতের দায় ও জবাবদিহি কোথায়?
এবার আসি ইয়েমেনের প্রসঙ্গে। ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটও ইয়েমেনে অভিযান চালিয়েছে। এই সংঘাতে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ বহু বছর ধরে ভয়াবহ দুর্ভোগের শিকার।
সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে হুতিদের বক্তব্য হচ্ছে, সৌদি সামরিক অভিযান বন্ধ না হলে তারা পাল্টা আঘাত চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে সৌদি আরব বিমানবন্দর ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলাকে তার নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছে।-The Guardian
ইয়েমেনের নিরীহ মানুষের ওপর অন্যায় হামলা হলে তারও প্রতিবাদ করতে হবে।সৌদি আরবের নিরীহ মানুষের ওপর হামলা হলে তারও প্রতিবাদ করতে হবে।কোনো পক্ষের পরিচয়, মতবাদ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিরপরাধ মানুষের জীবনকে কম মূল্যবান করে না।
হুতি আন্দোলনের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করতে গিয়ে সমগ্র শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যেমন ভুল, তেমনি সৌদি সরকারের কোনো সামরিক সিদ্ধান্তের দায় সমগ্র সৌদি জনগণের ওপর চাপানোও ভুল।
ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষা আমাদের বলে, অপরাধের দায় অপরাধীর। একটি গোষ্ঠীর কাজের জন্য অন্য একটি নিরপরাধ জনগোষ্ঠীকে অভিযুক্ত করা যায় না।
পঞ্চম প্রশ্ন: আল্লাহর মেহমানদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কত বড় দায়?
সম্মানিত পাঠক, আমাদের আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটি এখানেই।মক্কা-মদিনাগামী হাজি ও ওমরাহযাত্রীদের জন্য সৌদি আরবের বিমান যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেদ্দা ও মদিনার বিমানবন্দর বিশেষভাবে পবিত্র নগরীগুলোর যাতায়াতের সঙ্গে যুক্ত। রিয়াদসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও অনেক যাত্রীর সংযোগপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সুতরাং এসব বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে শুধু সাধারণ আন্তর্জাতিক যাতায়াত নয়, ইবাদতের উদ্দেশ্যে সফররত মানুষের যাত্রাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একজন মুসলমানের কাছে এই উদ্বেগের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ হাজিরা কোনো সাধারণ পর্যটক নন। তাঁরা এমন একটি ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে সফর করেন, যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি।
আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে সফররত মানুষের ওপর হামলা করা কি সরাসরি আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা নয়?পবিত্র ভূমিতে যাতায়াতকারী মানুষের নিরাপত্তা রক্ষা, তাঁদের ইবাদতের পথ নির্বিঘ্ন রাখা এবং নিরপরাধ মানুষের জীবন সুরক্ষিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব।
ষষ্ঠ প্রশ্ন: মুসলিম উম্মাহর করণীয় কী?
সম্মানিত পাঠক, আজ মুসলিম বিশ্বের সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু আবেগ প্রকাশ করা নয়; বরং আবেগের সঙ্গে বিবেক, ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সঙ্গে মানবিক দায়িত্বের সমন্বয় করা।
আমরা হারামাইন শরিফাইনের সম্মান চাই। আমরা সৌদি আরবের নিরীহ মানুষের নিরাপত্তা চাই। আমরা ইয়েমেনের নিরীহ মানুষের নিরাপত্তাও চাই। আমরা চাই, কোনো মা যেন যুদ্ধের কারণে তাঁর সন্তানকে হারিয়ে না ফেলেন। কোনো বাবা যেন বিমানবন্দরে বিদায় জানানো সন্তানের লাশ গ্রহণ করতে বাধ্য না হন।
আমরা চাই, বাংলাদেশের যে প্রবাসী বছরের পর বছর পরিশ্রম করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটান, তিনি যেন নিরাপদে কর্মস্থলে যেতে পারেন, নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন। আমরা চাই, যে বৃদ্ধ মানুষটি জীবনের শেষ সঞ্চয় দিয়ে হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁর মনে যেন বিমানবন্দরে হামলার আতঙ্ক না থাকে।
সৌদি আরবের নেতৃত্বের প্রতিও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান রয়েছে। হারামাইন শরিফাইনের খাদেম হওয়া কেবল একটি সম্মানজনক পরিচয় নয়। এটি বিপুল দায়িত্বের বিষয়। সেই দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে হাজিদের নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, শান্তি রক্ষা এবং সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের কল্যাণ বিবেচনা করা।
অন্যদিকে হুতি নেতৃত্বসহ সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের প্রতিও আহ্বান—রাজনৈতিক দাবি বা সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিরপরাধ মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও উচিত এমন কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা, যাতে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ তৈরি হয়।
শেষ কথা: পবিত্র ভূমির সম্মান, মানুষের জীবনের সম্মান
সম্মানিত দর্শক, আজকের সম্পাদকীয় শেষ করতে চাই হৃদয়ের গভীর থেকে আসা কয়েকটি কথা দিয়ে। আমরা সৌদি আরবকে শুধু তেলের দেশ হিসেবে চিনি না। আমরা সৌদি আরবকে শুধু অর্থনৈতিক শক্তি কিংবা রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখি না। আমরা এই দেশকে চিনি মক্কার জন্য। আমরা এই দেশকে চিনি মদিনার জন্য। আমরা এই দেশকে চিনি পবিত্র কাবার জন্য। আমরা এই দেশকে চিনি সেই মহান নবীর (স:) স্মৃতির জন্য, যাঁর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সেই মক্কা, যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আল্লাহর দরবারে হাত তোলেন। সেই মদিনা, যেখানে গিয়ে একজন মুসলমানের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। সেই মসজিদে নববী, যেখানে দাঁড়িয়ে একজন মুমিন তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাম পেশ করেন।
সেই ভূমির প্রতি আমাদের ভালোবাসা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য নয়। কোনো রাজপরিবারের প্রতি অন্ধ সমর্থনও নয়। এটি আমাদের ঈমানি অনুভূতি, আমাদের ধর্মীয় ইতিহাস এবং আমাদের আধ্যাত্মিক পরিচয়ের অংশ। তাই সৌদি আরবের বিমানবন্দরে যখন হামলার খবর আসে, যখন সেখানে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, ভারতীয় কিংবা অন্য কোনো দেশের নাগরিকের মৃত্যুর খবর আসে, তখন সেই বেদনা আমাদের হৃদয়কেও স্পর্শ করে।
কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই—একইভাবে ইয়েমেনের কোনো নিরীহ শিশু নিহত হলে, কোনো অসহায় মা স্বজন হারালে, সেই বেদনাও আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করা উচিত। কারণ ইসলামের শিক্ষা শুধু নিজের প্রিয় ভূমির জন্য ভালোবাসা নয়; ইসলামের শিক্ষা হলো ন্যায়বিচার, দয়া এবং নিরপরাধ মানুষের জীবনের প্রতি সম্মান।
আমাদের প্রশ্ন তাই কেবল এটুকু নয় যে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো আর কতবার হামলার শিকার হবে।আমাদের প্রশ্ন হলো—
আর কত মানুষের প্রাণ গেলে এই সংঘাতের অবসান হবে? আর কত পরিবার স্বজন হারালে যুদ্ধরত পক্ষগুলো শান্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে? আর কত নিরীহ মানুষকে রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধের মূল্য দিতে হবে?
আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে দোয়া করি—
হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র মক্কা ও মদিনাকে নিরাপদ রাখুন। হে আল্লাহ, আপনি বাইতুল্লাহ শরিফ ও মসজিদে নববীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখুন। হে আল্লাহ, আপনি হজ ও ওমরাহ পালনকারী আপনার মেহমানদের নিরাপদ রাখুন। হে আল্লাহ, আপনি সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের নিরীহ মানুষকে যুদ্ধ, রক্তপাত ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করুন। হে আল্লাহ, আপনি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বকে ন্যায়বিচার, প্রজ্ঞা ও শান্তির পথে পরিচালিত করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।
এখানেই শেষ করছি আজকের বিশেষ সম্পাদকীয়। আল্লাহ হাফেজ।

মতামত দিন