সৌদির তিন বিমানবন্দরে হামলা ও ফ্লাইট বিপর্যয়ের দাবি, আকাশপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নিজেস্ব প্রতিবেদক:
রিয়াদে প্রাণহানি, দাম্মামে হামলার খবর, আর জেদ্দায় ব্যাপক ফ্লাইট বাতিলের দাবি। সৌদি আরবের তিন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ।
মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার ব্যবধানে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও হামলার খবর সামনে এসেছে। প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, রোববার বিকেলে একটি প্রজেক্টাইল বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালে আঘাত হানে। এতে একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং অন্তত এগারো জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এর আগে টার্মিনাল থ্রিতে হামলার খবর পাওয়া গেলেও নতুন হামলার লক্ষ্য ছিল টার্মিনাল ফোর—এমনটাই বলা হচ্ছে। হামলার পর বিমানবন্দরের ভেতরে আগুন ছড়িয়ে পড়া, ছাদের অংশ ধসে পড়া এবং চারদিকে ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে থাকার বর্ণনা পাওয়া গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বলে উল্লেখ করা ফুটেজে কালো ধোঁয়া দেখা যাওয়ার দাবিও রয়েছে। তবে এসব ফুটেজের সত্যতা এবং নির্দিষ্ট ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
সবচেয়ে গুরুতর দাবিগুলোর একটি হলো, হামলায় সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি এয়ারবাস এ৩২০-২০০ উড়োজাহাজে আগুন ধরে সেটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এই তথ্য নিশ্চিত হলে বিমানবন্দরের অবকাঠামোর পাশাপাশি বিমান সংস্থার সম্পদেরও বড় ধরনের ক্ষতির বিষয়টি সামনে আসবে। তবে উড়োজাহাজটি ধ্বংস হওয়ার দাবির পক্ষে এখনো যাচাইকৃত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
রিয়াদের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হামলার খবর সামনে আসে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যায় বিমানবন্দরটিতে হামলা চালানো হয়। এরপর নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শনের দাবি করা হয়েছে। তবে সেখানে হতাহতের সংখ্যা কিংবা বিমানবন্দরের কার্যক্রম কতটা ব্যাহত হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও বড় ধরনের ফ্লাইট বিপর্যয়ের দাবি উঠেছে। প্রায় সত্তর শতাংশ ফ্লাইট বাতিল হওয়ার যে তথ্য প্রচারিত হয়েছে, সেটি নিশ্চিত করতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো কেন বারবার হামলার আলোচনায় আসছে?
এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের দিকে। ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিরোধ বহু বছর ধরে দেশটির নিরাপত্তা ও মানবিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে। ইয়েমেনের আকাশপথে বিধিনিষেধ, সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম এবং সামরিক অভিযানের প্রভাবও এই সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হুতি আন্দোলন অতীতে সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্যে এসব হামলাকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের জবাব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব বেসামরিক স্থাপনায় হামলাকে নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
তবে সামরিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু একটি দেশের যোগাযোগব্যবস্থার অংশ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হাজার হাজার যাত্রী, প্রবাসী শ্রমিক, বিমানকর্মী এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।
বিশেষ করে সৌদি আরবে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির জন্য বিমান চলাচলে যেকোনো বড় ধরনের বিঘ্ন গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লাইট বাতিল, যাত্রা বিলম্ব কিংবা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রবাসীদের যাতায়াত ও কর্মজীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো ঘিরে প্রচারিত হামলা ও ফ্লাইট বিপর্যয়ের খবর নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বিমানবন্দর বন্ধের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ, হতাহতের সংখ্যা এবং হামলার দায় কার—এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সৌদি আরবের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং ইয়েমেনের সংঘাতের উত্তেজনা কমাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী পদক্ষেপ নেবে?
সর্বশেষ যাচাইকৃত তথ্য সংযোজন
১২ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী:
রোববারের হামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং ১১ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
Al Jazeeraশনিবারের হামলায় প্রথমে ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হন। পরে আহত এক ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যুতে নিহতের সংখ্যা ১৩ জনে পৌঁছায়। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশিও রয়েছেন।
Saudi Gazetteদাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও রোববার হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
Arab News১২ অক্টোবর ভোরের ফ্লাইট তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদে ৬৪ শতাংশ, দাম্মামে ২৭ শতাংশ এবং জেদ্দায় ১৫ শতাংশ নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল ছিল।
Gulf Business
মতামত দিন