আন্তর্জাতিক
ছবি: সংগৃহীত

হুতিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি সৌদি আরবের।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সম্ভাব্য এই অভিযানে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীকে সামনে রেখে স্থলপথে অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তাদের সহায়তায় বিমান হামলা চালাতে পারে রিয়াদ।

রয়টার্সের শনিবার (৩ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, অভিযান শুরুর জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহের বিভিন্ন সময় বিবেচনায় রয়েছে। ছয়টি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও রিয়াদকে প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতা করছে। তবে এসব দেশ সরাসরি ইয়েমেনের যুদ্ধে যুক্ত হবে না বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

রিয়াদের সামনে থাকা পরিকল্পনার মধ্যে তুলনামূলক সীমিত একটি অভিযানও রয়েছে। এর আওতায় বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলে হুতিদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা হতে পারে। অন্য পরিকল্পনাটি অনেক বড় পরিসরের। এতে আল-বায়দা, মারিব, তাইজ ও আল-জাওফসহ একাধিক এলাকায় একই সময়ে সামরিক চাপ তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে।

পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো এবং উপকূলীয় এলাকার নিয়ন্ত্রণের সমীকরণ বদলানোই অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য। অভিযানের আকার অনুযায়ী এক লাখের বেশি ইয়েমেনি যোদ্ধা বা সেনা মাঠে নামতে পারে বলেও কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সম্ভাব্য সময় হিসেবে আগামী সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের পরের সময়—দুই ধরনের সম্ভাবনাই আলোচনায় রয়েছে।

বাব আল-মান্দেবের গুরুত্বও সৌদি পরিকল্পনায় বড় ভূমিকা রাখছে। লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের এই প্রণালি এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে নৌবাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ। আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

এক পশ্চিমা কূটনীতিক ও উপসাগরীয় এক কর্মকর্তার মতে, এই প্রণালির ওপর হুতিদের প্রভাব বজায় থাকলে সৌদি আরব নতুন করে শান্তি আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে কৌশলগত সমস্যায় পড়তে পারে। তাদের মতে, নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের বাড়তি চাপ প্রয়োগের সুযোগ দিচ্ছে।

তবে সম্ভাব্য অভিযান ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপের মতো বড় হবে না বলে মনে করেন সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‍্যাটনি। তার মতে, রিয়াদের লক্ষ্য পুরো হুতি সংগঠনকে নিশ্চিহ্ন করার চেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে আগের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে এনে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা হতে পারে।

ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক সম্পৃক্ততা নতুন নয়। ২০১৫ সালে গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে জোটের নেতৃত্ব দিয়েছিল রিয়াদ। হুতিরা তখন রাজধানী সানা দখলে নিয়ে ওই সরকারকে সরিয়ে দেয়। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও অঞ্চলটিতে উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি জাহাজ ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সম্ভাব্য নতুন সংঘাতে সৌদি আরবের পাশে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এক পশ্চিমা কূটনীতিক জানিয়েছেন, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণসহ গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ওয়াশিংটন সহযোগিতা করছে। তবে রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি বিমান হামলার সহায়তা চাইলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।

সৌদি আরবের সঙ্গে সম্প্রতি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করা তুরস্ক ও পাকিস্তানও রিয়াদকে সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানান, এডেনে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। দেশটির সামরিক উপদেষ্টারা সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইয়েমেনে অবস্থান করছেন বলেও কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।

ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানি সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়নি বলে অবশ্য পাকিস্তানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তবে সৌদি ভূখণ্ডের নিরাপত্তা এবং ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। ফ্রান্সও সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দর রক্ষায় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।

অন্যদিকে হুতিদের পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা সৌদি আরবের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষায় রিয়াদ মিত্রদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা সহায়তা চেয়েছে বলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

স্থল অভিযানের ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা তৈরি করছে ইয়েমেনের সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র দিলেও তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থানে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। গত শীতেও দক্ষিণাঞ্চলের সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত যোদ্ধাদের সঙ্গে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। পরে সৌদি-সমর্থিত পক্ষ ওই যোদ্ধাদের পরাজিত করে।

ফলে হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন অভিযান বাস্তবায়নে সৌদি আরবকে একদিকে সামরিক প্রস্তুতি, অন্যদিকে বিভক্ত ইয়েমেনি বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টিও সামলাতে হবে।

মতামত দিন