স্বাধীনতা বনাম শালীনতার প্রশ্ন, ‘আইনে লেখা নেই’—তাহলেই কি সবই বৈধ?
সম্প্রতি মেট্রোরেলে এক অ্যাথলেট ও কোচের পোশাক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে কেউ বলছেন ব্যক্তিস্বাধীনতার কথা, কেউ আবার জনসমক্ষে শালীনতার সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
একটি সভ্য সমাজের শক্তি হলো—তার নাগরিকরা আইন ভাঙার ভয়েই শুধু নয়, অন্য মানুষের প্রতি সম্মানবোধ থেকেও অনেক কিছু থেকে বিরত থাকেন।
সবকিছু আইন দিয়ে শেখানো যায় না। কিছু বিষয় পরিবার শেখায়, কিছু বিষয় সমাজ শেখায়, আর কিছু বিষয় মানুষ নিজের বিবেক থেকে শেখে।
মেট্রোরেলে কোথাও লেখা নেই—কী পোশাক পরে উঠতে হবে, আর কী পোশাক পরে উঠতে পারবে না। কোথাও লেখা নেই—পাগল, কিংবা ভিক্ষুক কিংবা অশালীন পোশাক পরা মানুষ মেট্রোতে উঠতে পারবে না।সবকিছু কি তাহলে লিখে দিতে হবে? সমাজের সব নিয়ম কি দেয়ালে টাঙিয়ে লিখে দিতে হয়? জনপরিসরে পোশাক ও আচরণের ক্ষেত্রে সামাজিক শালীনতার প্রশ্নটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
একটি সভ্য সমাজ কেবল আইন-কানুনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। লিখিত আইনের পাশাপাশি সেখানে থাকে অলিখিত সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত রুচিবোধ এবং অন্যের প্রতি সম্মান দেখানোর সংস্কৃতি। কোথায় কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয়—এটুকু বোঝার জন্য প্রতিটি বিষয়কে বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে না।
একজন মানুষ কী পোশাক পরবেন, সেটি অবশ্যই তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যখন জনপরিসরে প্রয়োগ করা হয়, তখন তার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নও যুক্ত হয়। কারণ মেট্রোরেল কোনো ব্যক্তিগত কক্ষ নয়; এটি নারী-পুরুষ, শিশু, বয়স্ক, শিক্ষার্থী, কর্মজীবীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের যৌথ গণপরিসর।
এখানেই একটি সাধারণ প্রশ্ন সামনে আসে, এই পোশাকটি কি তিনি তার জীবনের প্রতিটি সামাজিক পরিসরে পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন?
তিনি কি এই একই পোশাকে নিজের বিয়েতে যেতে পারবেন?
নিজের শ্বশুরবাড়িতে প্রথমবার গেলে কি এই পোশাক পরবেন?
পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন কিংবা ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে কি একই পোশাকে উপস্থিত হবেন?
কোনো সামাজিক বা করপোরেট অনুষ্ঠানে, যেখানে পোশাকের একটি নির্দিষ্ট সামাজিক প্রত্যাশা থাকে, সেখানেও কি তিনি একই পোশাকে যেতে চাইবেন?
এমনকি নিজের পরিবার ও আত্মীয়দের সামনে অন্তর্বাস পরে দাঁড়ানোকে যদি আমরা স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা না করি, তাহলে একই পোশাক জনসমক্ষে পরার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না কেন?
জিমে যে পোশাক স্বাভাবিক, সমুদ্রসৈকতে যে পোশাক স্বাভাবিক, ঘরের ভেতরে যে পোশাক স্বাভাবিক—সেটিই যে অফিস, আদালত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পারিবারিক অনুষ্ঠান বা গণপরিবহনে একইভাবে উপযুক্ত হবে, এমন কোনো কথা নেই।
আমরা যদি বলি, ‘আইনে তো নিষেধ নেই’, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—আইনে নিষেধ না থাকা প্রতিটি কাজ কি জনপরিসরে করার জন্য উপযুক্ত?
রাস্তায় উচ্চস্বরে অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করা সবসময় কি আলাদা করে নিষিদ্ধ করে লিখে রাখতে হয়? কাউকে উদ্দেশ্য করে অশোভন অঙ্গভঙ্গি করার আগে কি দেয়ালে নির্দেশনা দেখতে হয়? লাইনে দাঁড়ানো, বয়স্ক মানুষকে আসন ছেড়ে দেওয়া, অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা—এসবও কি আইন করে প্রতিটি নাগরিককে শেখাতে হবে?
ব্যক্তিস্বাধীনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, জনপরিসরে নিজের ইচ্ছাকে অন্য সবার স্বস্তি ও সামাজিক মূল্যবোধের ওপরে স্থান দিতে হবে।
আমার অবস্থান পরিষ্কার, মানুষের পোশাক তার ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে, কিন্তু গণপরিসর পুরোপুরি ব্যক্তিগত জায়গা নয়। সেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গে সামাজিক দায়িত্ব, পারিপার্শ্বিকতা এবং অন্য মানুষের স্বস্তির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়।
আজ আমরা মেট্রোরেলে আছি, কাল হয়তো স্কুল, কলেজ, অফিস, হাসপাতাল কিংবা অন্য কোনো গণপরিসরে থাকব। প্রতিটি জায়গার নিজস্ব সামাজিক পরিবেশ ও প্রত্যাশা আছে। সেই পার্থক্য বোঝার জন্য প্রতিটি দেয়ালে নিয়ম লিখে দিতে হয় না।
একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে—কোথায় কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে পোশাক পরতে হয়, অন্য মানুষের ব্যক্তিগত পরিসর কীভাবে সম্মান করতে হয়, জনসমক্ষে নিজের আচরণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়—তাহলে বড় হয়ে তার জন্য প্রতিটি বিষয় আলাদা করে বিধিমালায় লিখে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
মেট্রোরেলের শৃঙ্খলা শুধু দরজা-জানালা, টিকিট কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত আমাদের নাগরিক সংস্কৃতিও।
গণপরিবহনে ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকতে হবে। কারণ স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা তাই করা নয়; স্বাধীনতা মানে নিজের অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি অন্যের অধিকার ও স্বস্তির সীমাটুকুও সম্মান করা।
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক

মতামত দিন