জাতীয়
ছবি: সংগৃহীত

‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ, অপরাধ দমনে ডিটেনশনের প্রস্তাব পুলিশের

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

অপরাধ দমনের নামে দেশে একসময় কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর প্রচলন ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই ‘ক্রসফায়ার’ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়েছে।

তবে ওই সময় অপরাধীদের মধ্যে ‘ক্রসফায়ার’-এর ভয় কাজ করত। যদিও এ পদ্ধতি ছিল বিতর্কিত এবং সে সময়ের বিভিন্ন ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে অপরাধের মাত্রা বেড়েছে এবং অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের মতো ভয় পাচ্ছে না—এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আলোচনায়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও পুলিশের প্রতি আস্থার সংকট রয়েছে বলে তারা মনে করছেন।

এ পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মর্নিং মিটিংয়ে প্রয়োজনে অপরাধীদের ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে ডিটেনশনে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি পুলিশের অভ্যন্তরীণ দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে গোটা বাহিনীকে আরও সুসংগঠিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

'ক্রসফায়ার’ বন্ধ, ডিটেনশনের প্রস্তাব

পুলিশের গোপনীয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত মর্নিং মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। সভায় সব অতিরিক্ত আইজিপি, বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান, ডিআইজি (ক্রাইম), ডিআইজি (প্রশাসন)সহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, বর্তমানে ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ রয়েছে। তাই অপরাধীদের ডিটেনশনে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এ প্রস্তাব দেন অতিরিক্ত আইজিপি (এইচআরএম) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম।

তবে রেলওয়ে পুলিশপ্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান ঢালাওভাবে আটক না করে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় ডিটেনশনের পক্ষে মত দেন। তার মতে, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড বা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে নির্দিষ্ট ডেটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন।

আসামিদের দ্রুত জামিন নিয়ে উদ্বেগ

মর্নিং মিটিংয়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার আসামিরা দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সভায় বলা হয়, পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালেও অল্প সময়ের মধ্যেই তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, আইনি বাধ্যবাধকতা ও তদন্তে দুর্বলতার কারণেই অনেক আসামি দ্রুত জামিন পাচ্ছে।

সভায় আরও বলা হয়, ফৌজদারি কার্যবিধির নির্দিষ্ট বিধানের কারণে তদন্ত ও বিচার শেষ করতে বিলম্ব হলে আসামিরা জামিনের সুযোগ পেয়ে যায়। ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হলে কিছু ক্ষেত্রে জামিনের অধিকার তৈরি হয়। এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন এবং সেশন কোর্টে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা থাকলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয় না। ফলে এ সুযোগে আসামিরা জামিন পেয়ে যায়।

মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা বাড়ানোর প্রস্তাব

সভায় মাদক নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাবও আসে। একজন অতিরিক্ত আইজিপি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক হিসেবে পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

রেলওয়ে পুলিশপ্রধান ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান ডিএনসিকে পুলিশের প্রত্যক্ষ কমান্ড বা অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাব দেন। তার মতে, অপরাধের সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক রয়েছে এবং পুলিশও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে কাজ করে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে ডিএনসির ডিজি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, মাদক কেনাবেচা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং মাদকই বেশির ভাগ অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। তাই যে কোনো মূল্যে মাদক নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পুলিশের প্রতি জনআস্থা ফেরানোর তাগিদ

সভায় উপস্থিত এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন, অপরাধীদের জামিনের ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করা এবং পুলিশ প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই উচ্চপর্যায়ের মর্নিং সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশি সেবার মূল ভিত্তি হলো জনগণের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। শুধু কতটি ছিনতাই, ডাকাতি বা হত্যাকাণ্ড হয়েছে কিংবা কতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে—এসব পরিসংখ্যান দিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

পুলিশ বর্তমানে কোন অবস্থানে রয়েছে এবং সেই অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ কতটুকু সেবা দেওয়া সম্ভব, সেটিও নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পুলিশের প্রতি মানুষের ভুল বোঝাবুঝি ও অসন্তোষ দূর করতে সরাসরি জনসংযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্পর্কের উন্নয়ন এবং পুলিশের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা এলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাহিনীতে ‘কনফিউশন’ দূর করার তাগিদ

একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার সদস্যের বিশাল পুলিশ বাহিনীর মধ্যে বর্তমানে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিধা বা ‘কনফিউশন’ কাজ করছে। বাইরের নানা গুঞ্জন, অডিও-ভিডিও প্রচার এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের কারণে সদস্যদের মনোবলেও প্রভাব পড়ছে।

এ অবস্থায় বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করে গোটা পুলিশ বাহিনীকে ‘স্ট্রিমলাইনিং’ বা সুসংগঠিত করা জরুরি বলে তিনি মত দেন।

তার মতে, হঠাৎ বা একদিনের চেষ্টায় কোনো অলৌকিক পরিবর্তন সম্ভব নয়। এর জন্য ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন। কার্যকর পরিবর্তনের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি নীতিগত সংস্কারও প্রয়োজন।

আলোচনায় সাম্প্রতিক অপরাধের ঘটনা

সভায় চাঁদাবাজিসহ সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি আলোচিত অপরাধের ঘটনা উঠে আসে। এসব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা এবং আইনগত সীমাবদ্ধতা নিয়েও আলোচনা হয়।

আলোচনায় থাকা ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘রাড্ডা ম্যাটার্নাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে’ অতর্কিত হামলা, মোহাম্মদপুরে জমি দখলের উদ্দেশ্যে সশস্ত্র মব হামলা, ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীর নিউগিনি প্রোপার্টিজে সশস্ত্র হামলা, কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর এবং আদাবরে আটতলা বাড়ি দখলের চেষ্টা।

এ ছাড়া ২৫ মামলার আসামি শীর্ষ মাদক কারবারি ‘পিচ্চি রাজা’র প্রিজনভ্যান থেকে পলায়ন, চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যার ঘটনা, মিরপুরে চলন্ত যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ এবং জমি দখলকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ ও নাটোরে সংঘর্ষের ঘটনাও আলোচনায় আসে।

প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব

অপরাধ দমনে পুরোনো পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ফারুক আহমেদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দেন।

অন্যদিকে নৌপুলিশের অতিরিক্ত আইজি প্রধান করিম পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করে আদালতে পাঠালেও দ্রুত জামিন পাওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সিআইডিপ্রধান ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোছাইন ডিটেনশনকে একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দেন।

চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ

বিভিন্ন ইউনিটপ্রধানদের সঙ্গে সভা শেষে পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে যোগ দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।

ক্রাইম কনফারেন্সে আইজিপি বলেন, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার কোনো সুযোগ নেই—অপরাধীর একমাত্র পরিচয় সে অপরাধী।

তিনি কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

সভায় গুজব ও অপপ্রচার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ

ক্রাইম কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান। সভায় সব মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তর প্রান্তে ছিলেন ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সভাপতির বক্তব্যে অতিরিক্ত আইজি সাইদুর রহমান কিশোর গ্যাং সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। এসব গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের যথাযথভাবে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে, পুলিশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অপরাধ দমনে কঠোরতা, আইনি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, পুলিশের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মতামত দিন