অপরাধ
ছবি: সংগৃহীত

অপ্রতিমকে নিয়ে যাওয়া হয় তুহিনদের পাহাড়ি খামারে, এরপর মারধর চলে নির্যাতন।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যার তদন্তে নতুন করে সামনে এসেছে তুহিন হোসেনকে ঘিরে পুরোনো নানা অভিযোগ। ২০২৫ সালে তার বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল চুরির লিখিত অভিযোগ, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবি এবং পর্যটকদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের অভিযোগ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে।

এসব অভিযোগের পাশাপাশি অপ্রতীম হত্যার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) তুহিনকে আটক করেছে পুলিশ।

তুহিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার মো. নুরুল আলমের ছেলে। কুমিল্লা গভমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি। তবে ওই বছর পরীক্ষায় অংশ নেননি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তুহিনকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিম আহমেদ নামে আরও দুজনকে আটক করা হয়। অপ্রতীম হত্যার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

অন্যদিকে, হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে অপ্রতীমের হারিয়ে যাওয়া আইফোনটি তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। শনিবার রাতেই ফোনটি উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান।

তুহিনকে আটকের পর তার অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কোটবাড়ী-শালবন এলাকায় ঘোরাঘুরি করা পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে বলে কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় এবং তুহিনও এমন একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেন।

স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন, কোটবাড়ী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে ‘ফ্লাইং বার্ড’, ‘কিংস অব কোটবাড়ী’ ও ‘গ্যাং র‌্যাপ’সহ কয়েকটি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এসব গ্রুপে শতাধিক সদস্য সক্রিয় বলে তাদের দাবি। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা জানান।

অপ্রতীমকে একটি পাহাড়ি টিলার ওপর থাকা খামারে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল বলেও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, ওই খামারটি তুহিনদের। ঘটনাটি অনেকে দেখেছেন বলে দাবি করলেও তুহিনের ভয়ে তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না।

তুহিনের বিরুদ্ধে আগের একটি অভিযোগের নথিও শনিবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন আসাদুল্লাহ সোহাগ নামে এক ব্যক্তি। প্রকাশিত কপিতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তার পক্ষে তার মা মরিয়ম আক্তার কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় তুহিনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।

আসাদুল্লাহ সোহাগ তার পোস্টে দাবি করেন, তুহিন তাকে কৌশলে ডেকে নিয়ে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। পরে থানায় মামলা করতে গেলে মামলা না নিয়ে শুধু জিডি করা হয়েছিল বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কথা তাকে বলা হয়েছিল—এমন দাবিও করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো যাচাই এখনো পাওয়া যায়নি।

এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, তুহিন ও অভি নামে দুজনের আলাদা কিশোর গ্যাং রয়েছে এবং স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে গেলেও প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলা নেয়নি—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ও জিডির কপি প্রকাশ করেছেন কয়েকজন। এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।

অপ্রতীম হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ করেনি জেলা পুলিশ। কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টায় সংবাদ সম্মেলন করে পুরো বিষয়টি তুলে ধরবেন পুলিশ সুপার। ওই সংবাদ সম্মেলনেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি ও আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।

মতামত দিন