বোরো সামনে, বাড়ছে সার আমদানি; সেপ্টেম্বরেই আসছে আড়াই লাখ টন সার।
আগামী কয়েক মাসের বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দেশে নন-ইউরিয়া সারের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটে আমদানিতে সাময়িক ধীরগতি এলেও পরিস্থিতি কাটিয়ে এখন ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি সংগ্রহে আবারও গতি ফিরেছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, শুধু সেপ্টেম্বরেই তিন ধরনের সার নিয়ে সাতটি জাহাজ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব চালানে মোট ২ লাখ ৫০ হাজার টন সার আসবে। এর মধ্যে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) ১ লাখ ৫০ হাজার টন, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ৬০ হাজার টন এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ৪০ হাজার টন।
সেপ্টেম্বরের পরও আমদানি অব্যাহত থাকবে। আগামী মাসে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি নিয়ে আরও প্রায় ১০টি জাহাজ দেশে আনার প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব চালানের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এ মাসের চালানগুলোর মধ্যে মরক্কো থেকে আসছে ৬০ হাজার টন টিএসপি। ৩০ হাজার টন করে দুই চালানে সারটি দেশে আসবে এবং জাহাজ দুটির একটি ৮ সেপ্টেম্বর, অন্যটি ১১ সেপ্টেম্বর পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই দেশ থেকে আরও ৪০ হাজার টন ডিএপি আসছে। এ সারবাহী জাহাজটিও ৮ সেপ্টেম্বর দেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে এমওপি সংগ্রহ করা হচ্ছে রাশিয়া ও কানাডা থেকে। রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন করে দুই দফায় মোট ৭০ হাজার টন এবং কানাডা থেকে ৪০ হাজার টন করে দুই দফায় ৮০ হাজার টন এমওপি আমদানি করা হচ্ছে। চারটি চালানের মধ্যে দুটি জাহাজ চলতি সপ্তাহে আসার কথা। বাকি দুটির সম্ভাব্য আগমনের তারিখ ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর।
তবে আসন্ন পিক মৌসুমের তুলনায় বর্তমান আমদানি পরিকল্পনা কতটা পর্যাপ্ত হবে, সেটিও সামনে রাখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। বিএডিসির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে ডিএপির প্রয়োজন হবে ১১ লাখ ২৭ হাজার টন। এর বিপরীতে আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি প্রক্রিয়ায় থাকা ও আলোচনাধীন ডিএপির পরিমাণ ৬ লাখ ৮০ হাজার টন।
একই সময়ে এমওপির সম্ভাব্য চাহিদা ৬ লাখ ৭২ হাজার টন। এর বিপরীতে আমদানি প্রক্রিয়াধীন ও আলোচনায় থাকা পরিমাণ ৬ লাখ ৮০ হাজার টন। টিএসপির চাহিদা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ১৯ হাজার টন; এর বিপরীতে চূড়ান্ত আমদানি প্রক্রিয়ায় এবং সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় আলোচনায় রয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন।
বিএডিসির সার আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২টি জাহাজে ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বরের জাহাজগুলো ইতোমধ্যে দেশের পথে রয়েছে। অক্টোবরের কয়েকটি চালানের পণ্য জাহাজে তোলা শেষ হয়েছে, আর কিছু চালানে লোডিং চলছে। পরবর্তী চালানের জন্য দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রস্তুতিও চলছে।
সারের সরবরাহ নিয়ে এই তৎপরতার গুরুত্ব আরও বেড়েছে শীতকালীন চাষাবাদ সামনে থাকায়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলমের মতে, অক্টোবরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে সারের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। এ সময় বোরো ধানের পাশাপাশি শীতকালীন সবজি, আলু, পেঁয়াজ ও ভুট্টার চাষ শুরু হয়। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, সারা বছরের মোট সারের প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা তৈরি হয় এই সময়টিতে।
তাই শুধু আমদানি বাড়ানো নয়, কৃষকের প্রয়োজনের আগেই পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে সারের উৎপাদনও বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তিনি।
আমন মৌসুমে দেশের কয়েকটি এলাকায় সার না পাওয়ার অভিযোগের পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কুড়িগ্রামে এক ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে সারের কোনো সামগ্রিক ঘাটতি নেই।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সার আমদানি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ এবং চাহিদা অনুযায়ী প্রতি মাসেই তা করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৌদি আরব ও কাতার থেকে সাময়িকভাবে আমদানি ব্যাহত হলেও বিকল্প উৎস ও পথে সার সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাই আমদানি নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
মতামত দিন