ব্যবসায়-বাণিজ্য
ছবি: সংগৃহীত

তিস্তা মহাপ্রকল্পের পাশাপাশি চীনা জে-১০সিই ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কিনছে বাংলাদেশ।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে চীনের কাছ থেকে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

পাশাপাশি তিস্তা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে অগ্রগতি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক বৈঠকে এসব বিষয় উঠে এসেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠকে হুমায়ুন কবির চীনকে বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের ‘এক চীন নীতি’র প্রতি সরকারের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ককে ভবিষ্যতে ‘চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন সম্প্রদায়’ পর্যায়ে উন্নীত করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের ফলাফল নিয়েও বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে বাণিজ্যিক চুক্তি এবং সেখানে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনে সম্ভাব্য চীনা সহযোগিতা।

দুই দেশের আলোচনায় এসেছে সিইআইজেডে সম্ভাব্য চীনা বিনিয়োগের বিষয়টিও। প্রায় ৩০টি চীনা প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগ করতে পারে বলে জানানো হয়েছে। সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার এবং এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে আনুমানিক ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। দ্রুত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ শুরু এবং প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ে কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালুর বিষয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করেছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে চীনে কাঁঠাল ও পেয়ারা রপ্তানি, বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও আলোচনায় স্থান পেয়েছে।

চীনা রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, দেশটির চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি (CIDCA)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের (IDCPC) মন্ত্রী এবং ইউনান প্রদেশের নির্বাহী ভাইস গভর্নর শিগগির বাংলাদেশ সফর করতে পারেন। একই সঙ্গে হুমায়ুন কবিরকে অক্টোবরে চীন সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছেন তিনি।

জে-১০সিই নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাতেও চীনের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। চীন থেকে জে-১০সিই মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি এক সরকারি ব্রিফিংয়ে জানান, এ বিষয়ে সরকার গঠিত একটি কমিটি খসড়া চুক্তি তৈরির কাজ করছে। চলতি অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বাজেট সহায়তা পাওয়া গেলে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী বাজেটে এটি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট, যুদ্ধবিমান, অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইএভি ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান জাহেদ উর রহমান।

জে-১০সি এমআরসিএ ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে কমিটি পর্যায়ে আলোচনা করে একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও তিনি জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, চীনের তৈরি যুদ্ধবিমানটি আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানগুলোর মধ্যে বিবেচিত হচ্ছে এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতাও আলোচনায় এসেছে।

জাহেদ উর রহমানের দাবি, ইউরোপের রাফায়েল কিংবা ইউরোফাইটার টাইফুনের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমানের দাম কম। পাশাপাশি তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তব যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীনা বিমান ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে—যা বাংলাদেশকে এ ধরনের যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহী করেছে।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময়ও বাংলাদেশের কাছে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

সব মিলিয়ে তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পর্যন্ত একাধিক ক্ষেত্রে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রকল্পের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম কেনার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানো দুই দেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রার দিকও তুলে ধরছে।

সূত্র: এনডিটিভি 

মতামত দিন