আন্তর্জাতিক
ছবি: সংগৃহীত

দুর্যোগের আগেই বৈঠক, তবু চীনের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ নেপালের।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ও তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিচ্ছে নেপাল। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, তিব্বত থেকে হিমবাহ ও পানির স্তরের পরিবর্তন সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সুযোগ ছিল।

এই পরিস্থিতিতে চীনের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে কাঠমান্ডু। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির উচ্চতা সম্পর্কে প্রতি ১০ মিনিট পরপর তথ্য আদান-প্রদানের কথা রয়েছে। ভারতের সঙ্গে নেপালের যে ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেটির আদলেই চীনের সঙ্গে চুক্তি করতে চায় দেশটি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে গত ২৭ মে কাঠমান্ডুতে নেপাল ও চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখানে নেপালের ১০ জন এবং চীনের প্রায় এক ডজন কর্মকর্তা অংশ নেন। বৈঠকে সীমান্তবর্তী বন্যা ও আবহাওয়ার ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, বিপজ্জনক অঞ্চল চিহ্নিতকরণ এবং হিমবাহ থেকে সৃষ্ট হ্রদগুলোর তথ্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

নেপালের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের বিশেষজ্ঞ সৌহার্দ্য যোশির মতে, হিমবাহে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত নেপালকে জানানোর বিষয়ে আগ্রহ ছিল তাদের। কিন্তু বৈঠকের পর প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি।

নেপালের পানিবিশেষজ্ঞ বিনোদ পরাজুলিও তথ্যের ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, তিব্বতে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা সম্পর্কে চীন নিয়মিত তথ্য দিলেও তুষারধস, নদীর পানি বেড়ে যাওয়া, ভূমিধস কিংবা অন্যান্য চরম আবহাওয়ার বিষয়ে সবসময় পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায় না।

এমন অভিযোগের মধ্যেই ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে নেপাল ও তিব্বত। গত বুধবার হিমবাহধসের পর পাহাড়ি ঢল, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে দুই দেশে এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ বলে জানিয়েছে বিবিসি।

দুর্যোগের প্রায় দুই সপ্তাহ আগে অবশ্য সতর্কবার্তা পেয়েছিল নেপাল। ঘটনার ১২ দিন আগে চীনের ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল সেন্টার ই-মেইলে ভারী বৃষ্টি, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল। তবে নেপালের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু সাধারণ সতর্কবার্তার বদলে যদি আরও বিস্তারিত রিয়েল-টাইম তথ্য পাওয়া যেত, তাহলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হতো।

চীনা দূতাবাস অবশ্য নেপালের অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, সীমান্তবর্তী দুর্যোগ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সময়মতো বিনিময় করা হয়েছে। দুর্গম হিমালয় এলাকায় হিমবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করাও অত্যন্ত কঠিন বলে জানিয়েছে দূতাবাস।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো অস্টিন লর্ড বলেন, সাম্প্রতিক দুর্যোগের জন্য দুই দেশের ধীরগতির যোগাযোগকে সরাসরি দায়ী করা উচিত নয়। তবে ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় নেপাল ও চীনের মধ্যে আরও পরিষ্কার ও কার্যকর তথ্য বিনিময় কাঠামো থাকা দরকার।

নেপালের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সীমান্তের ওপারে কোনো বিপজ্জনক পরিবর্তন শুরু হলে তাৎক্ষণিকভাবে তথ্য পাওয়া গেলে আগাম সতর্কতা জারি করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বৃষ্টিপাত ও নদীর পানির উচ্চতা নিয়মিত জানার ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর তাই শুধু উদ্ধার কার্যক্রম নয়, ভবিষ্যৎ দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে নেপাল। চীনের সঙ্গে প্রস্তাবিত নতুন তথ্য বিনিময় চুক্তিকে সেই প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মতামত দিন