যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় চাপে বিশ্ববাজার, বাড়ল তেলের দাম।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর সুদের হার বাড়ানোর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। এতে শেয়ারবাজারে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের পরও পরিস্থিতিতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধও অব্যাহত রয়েছে।
রোববার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের একটি দ্বীপে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থানগুলোতে হামলা চালায়। জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের মাইন পাতা ঠেকাতে লারাক দ্বীপে রকেট উৎক্ষেপণের স্থানগুলোতে হামলা চালানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ তুলনামূলক শান্ত থাকার পর নতুন করে এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল।
এ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘কঠোরভাবে আঘাত’ করবে।
তবে সামরিক সংঘাত বাড়ানোর বদলে এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও চাপ অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। উত্তর ক্যারোলাইনায় জি-২০ বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, চলমান চাপ প্রয়োগের ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
এদিকে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের প্রধান দুই বেঞ্চমার্কের দামই বেড়েছে। এর আগে সোমবারও দুই শতাংশের বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। ন্যাশনাল অস্ট্রেলিয়া ব্যাংকের বিশ্লেষক রদ্রিগো ক্যাত্রিল মনে করেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরন দেখে বোঝা যায়, আপাতত কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াতে খুব আগ্রহী নয়। তবে আলোচনা স্থবির হয়ে পড়া এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব পরিস্থিতিকে আবারও বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বাজারে জ্বালানির মূল্য কমানোর উদ্যোগ নিয়েছেন ট্রাম্প। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার তেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে তার।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার পাশাপাশি সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এশিয়ার বেশির ভাগ শেয়ারবাজার মঙ্গলবার নিম্নমুখী ছিল। টোকিও, হংকং, সিউল, সাংহাই, সিডনি, সিঙ্গাপুর ও ওয়েলিংটনের বাজারে সূচক কমেছে। তবে তাইপে, ম্যানিলা ও জাকার্তার শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা গেছে।
চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ১৬ সেপ্টেম্বর। এর আগে কর্মসংস্থান ও ভোক্তা মূল্যসূচকসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করবে সুদের হার নিয়ে ফেডের পরবর্তী সিদ্ধান্ত।
ফেডের প্রধান কেভিন ওয়ার্শ সম্প্রতি সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে কঠোর অবস্থান তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যের পর বাজারে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রত্যাশা বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কার প্রভাব পড়েছে বন্ডের বাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। এর প্রভাব এশিয়ার বাজারেও দেখা যাচ্ছে। সোমবার জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
এদিকে হংকংয়ের শেয়ারবাজারে প্রথম দিনেই বড় ধাক্কা খেয়েছে ফাস্ট-ফ্যাশন কোম্পানি শেইন। বাজারে লেনদেন শুরুর দিন প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৯ শতাংশের বেশি কমে যায়। এর আগে আইপিওর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ১৭০ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছিল।
অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চিপ নির্মাতা এনভিডিয়া তাইওয়ানের মিডিয়াটেকে ৩৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।
ফলে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের শঙ্কায় জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ব শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে। আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপথ অনেকটা নির্ভর করবে।
মতামত দিন