ব্যবসায়-বাণিজ্য
ছবি: সংগৃহীত

আমদানি প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে নতুন নীতি চালু করল সরকার।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি প্রক্রিয়া আরও সহজ করতে নতুন নীতি চালু করেছে সরকার। ২০২৬-২০২৯ মেয়াদের আমদানি নীতিতে এলসি খোলার পাশাপাশি সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য আনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে আগের মতো নির্দিষ্ট মূল্যসীমাও থাকছে না।

সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন আমদানি নীতির গেজেট প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে আমদানি ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পাশাপাশি বিনিয়োগ, রপ্তানি ও শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকেরা বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্ট করে পণ্য আনতে পারবেন। আগের নীতিতে এলসি ছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে যে আর্থিক সীমা ছিল, নতুন আদেশে তা আর রাখা হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রচলিত বিকল্প লেনদেন পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে।

এর আগে ২০২১-২০২৪ মেয়াদের নীতিতে নির্দিষ্ট শর্তে এলসি ছাড়া আমদানি করা যেত। বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য এ ক্ষেত্রে বার্ষিক ৫ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থ পরিশোধের সীমা ছিল। নতুন নীতিতে সেই কাঠামো পরিবর্তন করে চুক্তিভিত্তিক আমদানিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফ্রি ট্রেড জোন ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস

নতুন নীতিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোন এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে আমদানি করা পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ, পুনঃরপ্তানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় বন্ডেড গুদাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য সুবিধা

বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের দেশে শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করতে নতুন নীতিতে আলাদা সুবিধা রাখা হয়েছে। তাদের অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ এবং উৎপাদনের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্প বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়ছে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ

রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানিতে সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।

উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ফ্রি অব কস্ট ভিত্তিতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগও রাখা হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এ ধরনের সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল

নতুন নীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বাড়ানো। এখন সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে।

আগের নীতিতে সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ১৬৫ সিসির বেশি ইঞ্জিনক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ ছিল। নতুন সীমা কার্যকর হওয়ায় বিদেশি ব্র্যান্ডের মাঝারি ও তুলনামূলক বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল দেশে আনার সুযোগ বাড়বে।

পণ্যের এইচএস কোড নিয়েও পরিবর্তন

আমদানির সময় পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার অসামঞ্জস্য নিয়ে ব্যবসায়ীদের যে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, তা কমানোর বিষয়টিও নতুন নীতিতে গুরুত্ব পেয়েছে। কোড ও পণ্যের বিবরণের মধ্যে পার্থক্যের কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব বা জটিলতা কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।

এলসিনির্ভরতা কমলেও নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ

নতুন নীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো এলসির বাইরে চুক্তিভিত্তিক আমদানির পরিধি বাড়ানো। এতে আমদানিকারকদের জন্য লেনদেনের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সমঝোতার সুযোগও বাড়বে।

তবে এলসির বাইরে আমদানি বাড়লে পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ, ওভার ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিং এবং অর্থপাচার ঠেকাতে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি জোরদার করার প্রয়োজন হবে।

বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ

২০২৬-২০২৯ আমদানি নীতিতে এফটিএ, সেপা, ইপিএ, পিটিএসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের অগ্রাধিকারমূলক বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে আমদানি ব্যবস্থাকে সেসব চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার সুযোগ থাকবে।

সব মিলিয়ে নতুন আমদানি নীতিতে ব্যাংকনির্ভর আমদানি ব্যবস্থার পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক বাণিজ্য, শিল্প বিনিয়োগ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, প্রবাসী বিনিয়োগ এবং লজিস্টিক সুবিধাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, এর মাধ্যমে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো।

মতামত দিন