নয় বছরেও থামেনি রোহিঙ্গা সংকট, প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকায় বাড়ছে নতুন চাপ।
মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংকট নবম বছরে পা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাবাসনের আলোচনা চললেও এখনো একজন রোহিঙ্গাকেও নিরাপদে মিয়ানমারে ফেরানো যায়নি।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। ভাসানচরেও রয়েছে কয়েক দশক হাজার মানুষ। নতুন অনুপ্রবেশকারীদের হিসাব ধরলে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য থেকে জানা যায়।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের পর অল্প সময়ের মধ্যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। প্রাণ বাঁচাতে আসা এসব মানুষের জন্য কক্সবাজারে দ্রুত আশ্রয়শিবির গড়ে তোলা হয়। সেই জরুরি আশ্রয় এখন দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে শিবিরগুলোর সংকটের ধরনও বদলেছে। খাবার ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কাজের সুযোগ সীমিত। শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবাও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলছে। ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ এবং নিরাপত্তার উদ্বেগ রোহিঙ্গাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নতুন চাপ এসেছে রাখাইনের যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে। ২০২৪ সাল থেকে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ বাড়তে থাকায় সীমান্তের ওপারে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অনেকে আবার বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। গত দেড়-দুই বছরে নতুন করে আসা মানুষের সংখ্যা দেড় লাখের বেশি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সংঘর্ষের কারণে সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
অর্থের সংকটও মানবিক সহায়তায় প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা আগের তুলনায় কমেছে। এতে শিশু ও নারীদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত অর্থায়ন না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবায় আরও ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ উপস্থিতির প্রভাব শুধু ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে পাহাড় কাটা, বসতি সম্প্রসারণ, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও বর্জ্যের কারণে পরিবেশের ওপরও পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব।
প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের তথ্য যাচাই, প্রত্যাবাসনের তালিকা এবং পরীক্ষামূলকভাবে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনাও সামনে এসেছে। কিন্তু নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় কোনো উদ্যোগই বাস্তবে প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি।
রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের বক্তব্য, নাগরিকত্বের অধিকার, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং নিজেদের বসতভিটায় ফেরার নিশ্চয়তা ছাড়া তারা মিয়ানমারে ফিরতে চান না। তাদের মতে, শুধু সীমান্ত পার করে দিলেই সংকটের সমাধান হবে না; সেখানে টেকসই নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশও বলছে, রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হলে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। এ জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত উদ্যোগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নয় বছর পর রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনিশ্চিত। নতুন করে মানুষের আগমন, ক্যাম্পের নিরাপত্তা সমস্যা, কমে যাওয়া সহায়তা এবং পরিবেশগত চাপ মিলিয়ে বাংলাদেশের জন্য এই সংকট ক্রমেই দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।

মতামত দিন