বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

২০২৭ সালে দিনের বেলা রাতের আবহ, ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড স্থায়ী হবে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

ভাবুন, স্বাভাবিক একটি কর্মদিবস। চারদিকে ঝলমলে রোদ।

হঠাৎ কয়েক মিনিটের মধ্যে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে গেল, আকাশ অস্বাভাবিক অন্ধকারে ঢেকে গেল। দিনের মাঝেই চারপাশের পরিবেশ যেন সন্ধ্যার রূপ নিল। এরপর আবার ধীরে ধীরে ফিরে এল সূর্যের আলো।

এমন দৃশ্যই দেখার সুযোগ তৈরি হবে ২০২৭ সালের ২ আগস্ট। ওই দিন একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটবে, যার সর্বোচ্চ পূর্ণগ্রাস পর্যায় বা ‘টোটালিটি’ স্থায়ী হবে ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড। নাসার জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক হিসাবেও এই সময়কাল নিশ্চিত করা হয়েছে।

এই গ্রহণের বিশেষত্ব শুধু এর স্থায়িত্বে নয়। স্থলভাগ থেকে দেখা পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে ১৯৯১ সালের পর এটিই সবচেয়ে দীর্ঘ এবং ২১১৪ সালের আগে এমন দীর্ঘস্থায়ী পূর্ণগ্রাস আর দেখা যাবে না।

কেন দিনের আলো হঠাৎ কমে যাবে?

সূর্যগ্রহণ ঘটে তখনই, যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এমনভাবে অবস্থান নেয় যে তার ছায়া পৃথিবীর ওপর পড়ে। পূর্ণগ্রাসের ক্ষেত্রে চাঁদ সূর্যের পুরো দৃশ্যমান চাকতিকে ঢেকে দেয়। তখন চাঁদের ঘন ছায়ার সরু পথের মধ্যে থাকা এলাকাগুলোতে দিনের আলো কয়েক মুহূর্তের জন্য নাটকীয়ভাবে কমে যায়।

এ সময় সূর্যের উজ্জ্বল পৃষ্ঠ আড়ালে চলে যাওয়ায় এর বাইরের বায়ুমণ্ডল বা করোনা দৃশ্যমান হয়। আকাশের উজ্জ্বলতাও দ্রুত কমে আসে। ফলে কয়েক মিনিটের জন্য দিনের পরিবেশ অনেকটা সন্ধ্যার মতো মনে হতে পারে।

কোথায় দেখা যাবে পূর্ণগ্রাস?

২০২৭ সালের গ্রহণের পূর্ণগ্রাসের পথ ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তর আফ্রিকা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বিস্তৃত হবে। দক্ষিণ স্পেন, মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসর, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকা এই পথের মধ্যে থাকবে। সোমালিয়ার কিছু অংশ থেকেও পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে না। চাঁদের পূর্ণ ছায়া পৃথিবীর ওপর একটি নির্দিষ্ট ও তুলনামূলক সরু পথে অগ্রসর হবে। ওই পথের বাইরে থাকা বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সূর্য আংশিক ঢাকা পড়বে, ফলে আলো কিছুটা কমলেও পূর্ণ অন্ধকার তৈরি হবে না।

গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে মিসরের কাছাকাছি অঞ্চলে। নাসার হিসাবে ওই সময় পূর্ণগ্রাসের কেন্দ্রীয় স্থায়িত্ব হবে ৬ মিনিট ২৩ সেকেন্ড এবং ছায়ার পথের সর্বোচ্চ প্রস্থ প্রায় ২৫৮ কিলোমিটার।

কেন এত দীর্ঘ হবে এই গ্রহণ?

পূর্ণগ্রাস কতক্ষণ স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবীর পারস্পরিক অবস্থান এবং তাদের দূরত্বের ওপর। চাঁদের কক্ষপথ পুরোপুরি গোল নয়। ফলে পৃথিবী থেকে কখনো চাঁদকে তুলনামূলক বড়, আবার কখনো ছোট দেখা যায়।

চাঁদ যখন আকাশে সূর্যের তুলনায় যথেষ্ট বড় দেখায় এবং তার ছায়া পৃথিবীর ওপর অনুকূলভাবে পড়ে, তখন সূর্যের পুরো চাকতি ঢেকে রাখার সময় বেড়ে যেতে পারে। ২০২৭ সালের গ্রহণে ঠিক এমন একটি অনুকূল জ্যামিতিক পরিস্থিতি তৈরি হবে।

এই কারণেই এটি আগামী কয়েক দশকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্রহণের সময় কী দেখা যেতে পারে?

পূর্ণগ্রাস শুরু হলে পরিবেশের আলো দ্রুত বদলে যাবে। সূর্যের করোনা স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে, যা সাধারণ সময়ে সূর্যের তীব্র আলোর কারণে খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়। তাপমাত্রায় সাময়িক পরিবর্তনও অনুভূত হতে পারে। প্রাণী ও পাখির আচরণেও স্বল্প সময়ের জন্য পরিবর্তন দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তবে এই বিরল দৃশ্য দেখার সময় চোখের নিরাপত্তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ সানগ্লাস দিয়ে সূর্যের দিকে তাকানো নিরাপদ নয়। গ্রহণের আংশিক পর্যায়ে অবশ্যই উপযুক্ত সৌর পর্যবেক্ষণ চশমা বা অনুমোদিত সোলার ভিউয়ার ব্যবহার করতে হবে।

২০২৭ সালের ২ আগস্টের এই মহাজাগতিক ঘটনা তাই শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, আকাশপ্রেমীদের কাছেও হতে যাচ্ছে একটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা—যেদিন পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় দুপুরের আকাশ কয়েক মিনিটের জন্য রাতের আবহ তৈরি করবে।

মতামত দিন