অটো-রিকশার নৈরাজ্যে রক্তাক্ত সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ—কর নিবে রাষ্ট্র, দায় নিবে কে?
সম্পাদকীয়:
ঢাকার সড়কে এখন যেন দুই ধরনের আইন চলছে। একটি আইন নিবন্ধিত মোটরযানের জন্য—যেখানে গাড়ির নম্বর আছে, মালিকের পরিচয় আছে, চালকের লাইসেন্স আছে এবং সামান্য অনিয়মও ক্যামেরা, এআই প্রযুক্তি কিংবা ট্রাফিক পুলিশের চোখ এড়ানোর সুযোগ কম।
অন্য আইনটি যেন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অনিবন্ধিত তিন চাকার যানের জন্য—যেখানে দৃশ্যমান নম্বর নেই, কার্যকর নিবন্ধন নেই, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চালকের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, ফিটনেস যাচাই নেই এবং দুর্ঘটনা বা সম্পদের ক্ষতি করার পর দায় নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থাও নেই।
প্রশ্ন হচ্ছে, একই সড়ক ব্যবহার করেও নাগরিকদের জন্য এই দুই রকম ব্যবস্থা কেন?
একজন প্রাইভেট কারের মালিক গাড়ি কেনার সময় সরকারকে শুল্ক ও কর দেন। নিবন্ধন, ফিটনেস, ট্যাক্স টোকেন, অগ্রিম আয়কর, বীমা এবং অন্যান্য ফি মিলিয়ে তাকে নিয়মিত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। গাড়ির ধরন অনুযায়ী শুধু বার্ষিক কর ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ই অনেক ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে। মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, বাস, ট্রাক—প্রতিটি নিবন্ধিত যান কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।
এরপরও চালক ভুল করলে তাকে জরিমানা দিতে হয়। লালবাতি অমান্য, ভুল স্থানে গাড়ি রাখা, লাইসেন্স বা কাগজপত্রের ত্রুটি, উল্টো পথে চলা কিংবা অন্য কোনো ট্রাফিক অপরাধের জন্য আইন অনুযায়ী কয়েক হাজার থেকে বহু হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। বর্তমানে ক্যামেরা ও প্রযুক্তিনির্ভর শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও যুক্ত হয়েছে। গাড়ির নম্বর শনাক্ত করে মালিকের কাছে মামলা বা জরিমানার তথ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আইন প্রয়োগের এই ব্যবস্থা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। নিবন্ধিত গাড়ির মালিক কর দেন বলে তিনি আইন ভাঙার অধিকার পান না। কিন্তু ন্যায়সংগত প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: আইন কি শুধু তাকেই শনাক্ত করবে, যার নম্বরপ্লেট আছে? যে যান নম্বরপ্লেট ছাড়াই প্রধান সড়কে উঠে আসছে, ট্রাফিক সংকেত অমান্য করছে, উল্টো পথে চলছে, হঠাৎ লেন পরিবর্তন করছে এবং অন্যের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করছে—তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কেন অসহায় থাকবে?
ঢাকার অলিগলিতে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি বহু যাত্রীর সুবিধা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার মাধ্যম। কিন্তু জীবিকার প্রয়োজন কখনো আইন অমান্য করার লাইসেন্স হতে পারে না। একইভাবে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক হওয়াও কাউকে সড়কের ওপর বিশেষ অধিকার দেয় না। সড়ক সবার; তাই নিয়ম ও দায়ও সবার জন্য সমান হতে হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, অনেক ব্যাটারিচালিত রিকশা স্থানীয়ভাবে তৈরি। প্রচলিত রিকশার কাঠামোর সঙ্গে মোটর ও ভারী ব্যাটারি যুক্ত করে এগুলো চালানো হচ্ছে। কিন্তু বাড়তি গতি ও ওজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রেক, স্টিয়ারিং, আলো, সিগন্যাল, চাকা ও কাঠামোগত নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, তার নিয়মিত পরীক্ষা নেই। ফলে একটি ধীরগতির মানবচালিত রিকশার জন্য তৈরি কাঠামো মোটরচালিত যানে রূপান্তরিত হলেও তার নিরাপত্তা যাচাই হচ্ছে না।
আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে চালকের প্রশিক্ষণ। অনেক চালক ট্রাফিক সংকেত, লেন, মোড় নেওয়ার নিয়ম, পথচারীর অগ্রাধিকার কিংবা প্রধান সড়কের ঝুঁকি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই যান চালাচ্ছেন। এটি চালকের সামাজিক বা শিক্ষাগত পরিচয়ের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্র ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা। প্রশিক্ষণ ছাড়া কাউকে মোটরচালিত যান নিয়ে জনবহুল সড়কে নামতে দেওয়া হলে দুর্ঘটনার দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে কর্তৃপক্ষ মুক্ত হতে পারে না।
একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা কোনো গাড়িতে আঘাত করলে ক্ষতির পরিমাণ কখনো কয়েক হাজার, কখনো কয়েক লাখ টাকা হতে পারে। আধুনিক গাড়ির বাম্পার, সেন্সর, ক্যামেরা, হেডলাইট কিংবা বডির সামান্য ক্ষতিও মেরামত করতে বড় অঙ্কের অর্থ লাগে। অথচ অভিযুক্ত রিকশায় নম্বর না থাকলে সেটিকে পরবর্তী সময়ে শনাক্ত করার উপায় থাকে না। চালকের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পান না। অনেক ক্ষেত্রে চালক ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান, ক্ষতি অস্বীকার করেন অথবা পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
এখানে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িমালিকের প্রশ্নটি অত্যন্ত সংগত: রাষ্ট্র যখন আমার গাড়ির নম্বর ধরে কর ও জরিমানা আদায় করতে পারে, তখন যে যান আমার সম্পদের ক্ষতি করল, তার পরিচয় ও দায় নিশ্চিত করতে পারে না কেন?
আইনের সামনে সমতা মানে শুধু সবাইকে জরিমানা করা নয়; ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিককে প্রতিকার দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কর আদায় এবং শাস্তি প্রয়োগে রাষ্ট্র শক্তিশালী হবে, অথচ নাগরিকের সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষার সময় অসহায় হয়ে পড়বে—এটি কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
দীর্ঘদিন ব্যাটারিচালিত রিকশার দায়িত্ব বিআরটিএ, সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কার্যত ঘুরপাক খেয়েছে। কে নিবন্ধন দেবে, কে রুট নির্ধারণ করবে, কে চালকের লাইসেন্স দেবে এবং কে ফিটনেস পরীক্ষা করবে—এসব প্রশ্নে স্পষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ২০২৫ সালে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ই-রিকশা চলাচলের বিধিমালা জারি এবং ২০২৬ সালে আইনি সংশোধনের মাধ্যমে নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স দেওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ এসেছে। কিন্তু কাগজে বিধিমালা থাকা এবং সড়কে তা বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। রাজধানীর বাস্তব চিত্র বলছে, প্রয়োগ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।
সমাধান হিসেবে শুধু অভিযান চালিয়ে রিকশা আটক করা যথেষ্ট নয়। আবার রাজনৈতিক বা মানবিক চাপের মুখে সব যানকে অবাধে চলতে দেওয়াও সমাধান নয়। সরকারকে অবিলম্বে কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে।
প্রথমত, প্রতিটি ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দৃশ্যমান ইউনিক নম্বর ও ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। নিবন্ধনে চালক, প্রকৃত মালিক, গ্যারেজ এবং পরিচালনাকারী সমিতির তথ্য থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, চালকের ছবি-সংবলিত লাইসেন্স, ন্যূনতম বয়স, পরিচয় যাচাই এবং বাধ্যতামূলক ট্রাফিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে কাউকে মোটরচালিত যান চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।
তৃতীয়ত, ঢাকার কোন সড়কে এসব যান চলবে, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। অলিগলি ও নির্ধারিত ফিডার রুটে নিয়ন্ত্রিত চলাচলের সুযোগ রাখা যেতে পারে; কিন্তু দ্রুতগতির প্রধান সড়ক, ভিআইপি সড়ক, ফ্লাইওভার ও ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগস্থলে অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
চতুর্থত, অনুমোদিত নকশা, কার্যকর ব্রেক, সামনে-পেছনে আলো, ইন্ডিকেটর, গতি-নিয়ন্ত্রক এবং নিরাপদ ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়া কোনো যানকে নিবন্ধন দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিটনেস পরীক্ষাও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পঞ্চমত, স্বল্পমূল্যের বাধ্যতামূলক তৃতীয় পক্ষের বীমা অথবা কেন্দ্রীয় ক্ষতিপূরণ তহবিল চালু করতে হবে। এতে দুর্ঘটনায় মানুষ আহত হলে কিংবা অন্যের গাড়ি ও সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বাস্তব পথ তৈরি হবে। চালকের সামর্থ্য না থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিককে সম্পূর্ণ অসহায় থাকতে হবে না।
ষষ্ঠত, শুধু দরিদ্র চালককে জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। অনিবন্ধিত যান রাস্তায় নামানো মালিক, গ্যারেজ, নির্মাতা, চার্জিং কেন্দ্র এবং প্রভাবশালী সমিতিকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ লাভ যদি মালিক ও নিয়ন্ত্রক চক্র পায়, তবে সমস্ত দায় শুধু চালকের ঘাড়ে চাপানোও অন্যায়।
সবশেষে প্রশাসনকে মনে রাখতে হবে, কঠোরতা মানে দুর্বল মানুষের ওপর শক্তি প্রদর্শন নয়। প্রকৃত কঠোরতা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে প্রাইভেট কার, বাস, মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা—প্রত্যেকেই পরিচয়যোগ্য, প্রশিক্ষিত, নিরাপদ এবং আইনের কাছে সমানভাবে দায়বদ্ধ থাকবে।
ঢাকার সড়ক কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কিন্তু এটি এমন কোনো দায়মুক্ত অঞ্চলও নয়, যেখানে নম্বরপ্লেট না থাকলেই আইন অকার্যকর হয়ে যাবে। নিবন্ধিত যানবাহনের মালিকদের কাছ থেকে কর ও জরিমানা আদায় করা হবে, অথচ তাদের জীবন বা সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকবে না—এই বৈষম্য আর চলতে পারে না।
রাষ্ট্রকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে: সড়কে কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, নাকি পরিচয়হীন ও নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহনের সামনে আইনই অসহায় হয়ে থাকবে?
একই সড়কে দুই আইন নয়—নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান হতে হবে
এম. সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক
মতামত দিন