বুবির রক্তে লেখা থাকুক আমাদের ব্যর্থতার ইতিহাস।
সম্পাদকীয়:
একজন মানুষকে দ্বিতীয়বার হত্যা করতে অস্ত্র লাগে না। তাকে ভুলে গেলেই যথেষ্ট।
নরসিংদীর মেথিকান্দা রেলস্টেশনের বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধা বুবির মৃত্যু তাই শুধু একটি ছিনতাই বা হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সমাজ ও মানবিকতার নির্মম ব্যর্থতার প্রতীক। প্রায় ২৫ বছর ধরে একটি রেলস্টেশনই ছিল তাঁর আশ্রয়। পরিবার ছিল না, পরিচয় ছিল না, নিরাপত্তা ছিল না; ছিল শুধু বেঁচে থাকার এক নীরব সংগ্রাম। মানুষের ফেলে যাওয়া ময়লা পরিষ্কার করে, সামান্য সহায়তা আর কষ্টার্জিত উপার্জন থেকে অল্প অল্প করে জমিয়েছিলেন প্রায় ৪০ হাজার টাকা। সেই টাকাই হয়ে উঠল তাঁর মৃত্যুর কারণ। যে সমাজে একজন সত্তর বছরের বাক্প্রতিবন্ধী নারীকে গভীর রাতে নির্দ্বিধায় মারধর করে তাঁর শেষ সম্বল ছিনিয়ে নেওয়া যায়, সেই সমাজ সভ্যতার দাবি করতে পারে না।
ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, বোবা মানুষের কোনো শত্রু থাকে না। কিন্তু বুবির মৃত্যু সেই শিক্ষাকেই নির্মমভাবে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। কারণ এই পৃথিবীতে দুর্বল, অসহায় কিংবা প্রতিবন্ধী হওয়া অনেক সময় অপরাধীর কাছে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। যারা একজন আত্মরক্ষা করতে না পারা বৃদ্ধাকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে, তারা কেবল আইনভঙ্গকারী নয়; তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুধু কি তারাই দায়ী? আমরা কি সত্যিই নির্দোষ? বছরের পর বছর একজন অসহায় নারী একটি পরিত্যক্ত কক্ষে বসবাস করেছেন, কোনো সামাজিক নিরাপত্তা পাননি, তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ হয়নি, তাঁর চিকিৎসা, পুনর্বাসন কিংবা নিরাপত্তার দায়িত্ব কেউ নেয়নি। আমরা তাঁকে দেখেছি, কিন্তু দেখিনি; তাঁর পাশে দিয়ে হেঁটেছি, কিন্তু তাঁর জীবন নিয়ে ভাবিনি। এই উদাসীনতাও এক ধরনের অপরাধ।
এখন প্রয়োজন শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ বলে মনে না করা। দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এমন নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড ও জনসমাগমস্থলে বসবাসরত অসহায়, প্রতিবন্ধী ও পরিচয়হীন মানুষের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আশ্রয় ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। রেলওয়ে, স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় দায়িত্বই হলো সেই মানুষটির পাশে দাঁড়ানো, যার পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ নেই।
বুবির জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক শুধু তাঁর মৃত্যু নয়; বরং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ নীরবতা। তিনি অভিযোগ করতে পারেননি, নিজের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারেননি, সাহায্য চাইতেও পারেননি। অথচ তাঁর এই নীরব জীবন আমাদের প্রতিদিন প্রশ্ন করে—কতজন বুবি আমাদের আশপাশে বেঁচে আছেন, যাদের আমরা দেখেও দেখি না? কতজন মানুষ সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন, অথচ তাদের অস্তিত্ব আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না?
বুবির জন্য হয়তো কোনো শোকসভা হবে না, কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হবে না, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে হারিয়ে না যায়। এই হত্যাকাণ্ডকে শুধু একটি অপরাধ হিসেবে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। কারণ যে সমাজ তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটিকেও নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন, অগ্রগতি কিংবা সভ্যতার সব দাবিই প্রশ্নবিদ্ধ।
বুবি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু আমরা চাইলে তাঁর মৃত্যু অর্থহীন হতে দেব না। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, অসহায় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা জাগিয়ে তোলার মধ্য দিয়েই তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো সম্ভব। অন্যথায় ইতিহাস শুধু লিখে রাখবে—একজন বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধাকে কিছু দুর্বৃত্ত হত্যা করেছিল; আর একটি সমাজ নীরবে তা দেখেছিল। তখন এই হত্যাকাণ্ডের দায় শুধু ছিনতাইকারীদের নয়, আমাদের সবার কাঁধেই বর্তাবে।
এম সুজন হোসাইন
সম্পাদক ও প্রকাশক।
মতামত দিন