ব্যবসায়-বাণিজ্য
ছবি: সংগৃহীত

সব সূচকে নতুন রেকর্ড চট্টগ্রাম বন্দরের।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়, জাহাজ পরিচালনা এবং ডিজিটাল সেবায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একাধিক নতুন রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। একই সময়ে বহির্নোঙরে জাহাজের অপেক্ষা পুরোপুরি দূর করে আবারও ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ অর্জনের দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বুধবার (১ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে মোট ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন কার্গো পরিবহন হয়েছে, যা ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সমান। এছাড়া বন্দরে মোট ৪ হাজার ৩৩৬টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি।

আর্থিক দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। সরকারকে কর হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছে ৯৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা। কর-পরবর্তী উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

পরিচালন দক্ষতা বাড়ায় কনটেইনারবাহী জাহাজের গড় অবস্থানকাল ২ দশমিক ৫৮ দিন থেকে কমে ২ দশমিক ৩৮ দিনে নেমে এসেছে। এর ফলে জাহাজের টার্ন-অ্যারাউন্ড সময় কমেছে এবং বহির্নোঙরে অপেক্ষার প্রয়োজন প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। এতে শিপিং কোম্পানির ব্যয় কমার পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমও আরও গতিশীল হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও মুখপাত্র মো. নাসির উদ্দিন বলেন, বন্দরের সব প্রবেশপথে শতভাগ ই-গেট পাস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ই-ডেলিভারি অর্ডার (ই-ডিও), অনলাইন এনওসি, ই-চালান, কার্ট টিকিট এবং ওয়ান-স্টপ ডকুমেন্টেশনসহ বিভিন্ন সেবা সম্পূর্ণ কাগজবিহীন করা হয়েছে।

তিনি জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) সংযুক্ত হওয়ায় তথ্য আদান-প্রদান দ্রুত ও স্বচ্ছ হয়েছে। এছাড়া ‘সিপিএ স্কাই’ নামে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাস্টমস, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এক প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে। ডিজিটাল অবকাঠামো সুরক্ষায় আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আবারও ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এর ফলে বহির্নোঙরে কোনো জাহাজকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। দ্রুত পণ্য ওঠানামা করায় শিপিং কোম্পানির সময় ও পরিচালন ব্যয় কমছে, আমদানিকারকেরা দ্রুত পণ্য পাচ্ছেন এবং রপ্তানিকারকেরাও নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে পারছেন। ঈদের ছুটির সময়ও ২৪ ঘণ্টা বন্দর পরিচালনা অব্যাহত রেখে এ কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নেও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডের আন্তর্জাতিক পরিদর্শনে চট্টগ্রাম বন্দর ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন করেছে। পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারির ফলে বহির্নোঙরে ডাকাতি ও চুরির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৪০ সালের মধ্যে বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং ৩০৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন টিইইউসে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, বে টার্মিনাল, হেভি লিফট কার্গো জেটি এবং বহুমুখী পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, আর্থিক ও পরিচালনগত এসব অর্জন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সেবার আধুনিকায়নের ফল। ভবিষ্যতেও চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের একটি স্মার্ট পোর্ট হিসেবে গড়ে তোলার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

মতামত দিন