সম্পাদকীয়
ছবি: সংগৃহীত

স্বপ্ন গড়তে কোটি টাকার ঋণ, আর ভাঙতে কয়েক মিনিট, আইনের শাসন কোথায়?

সম্পাদকীয়:

প্রায় আট মাসের নিরলস পরিশ্রম। দিন-রাতের ঘাম, স্বপ্ন আর বিনিয়োগের সমন্বয়ে একটি স্বপ্নের আউটলেট দাঁড় করিয়েছিলেন আশিক খান।

সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছিল ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ।কিন্তু সেই স্বপ্নের ঠিকানাতেই যদি প্রকাশ্য দিবালোকে একদল মানুষ ঢুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, কর্মীদের ওপর হামলা চালায় এবং পণ্য নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ হয়—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: আইন কি কেবল কাগজে আছে, নাকি বাস্তবেও তার কার্যকর প্রয়োগ আছে?

১১ সেপ্টেম্বর Live Shopping-এ যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সকাল থেকে স্বাভাবিকভাবে ক্রেতারা কেনাকাটা করছিলেন। এর মধ্যেই ১০–১৫ জনের একটি দল শোরুমে প্রবেশ করে কেনাকাটা না করে “ভুয়া, ভুয়া” স্লোগান দিতে শুরু করে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে শোরুমের বাইরে অবস্থান নেন।

Live Shopping-এ ওই দলটি অফারের নির্ধারিত নিয়মের বাইরে বিশেষ সুবিধা দাবি করেছিল। সেই দাবি পূরণ না করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে কর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও মারমুখী আচরণের ঘটনা ঘটে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হওয়ার পর কয়েকজন শোরুমের পোশাক, জুতা, সানগ্লাস, বেল্ট, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বেরিয়ে যান। প্রতিষ্ঠানের দাবি, এসব ঘটনার ভিডিও প্রমাণ তাদের কাছে রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পরে শোরুমের গেট বন্ধ করতে হয় এবং ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রাতেই ভিডিও প্রমাণসহ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতেই পারে। কোনো অফার নিয়ে অসন্তোষ থাকতে পারে। কিন্তু অভিযোগের সমাধান কি হামলা, ভয় দেখানো, বিশৃঙ্খলা কিংবা জোর করে পণ্য নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে হতে পারে? অবশ্যই পারে না।

একজন ব্যবসায়ী কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন—আর কোনো বিরোধ বা অভিযোগের কারণে যদি একটি দল আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন উদ্যোক্তা নন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো ব্যবসায়িক পরিবেশ।

আরেকটি বিষয়ও equally গুরুত্বপূর্ণ—গণমাধ্যমের দায়িত্ব। Live Shopping-এর অভিযোগ, কিছু গণমাধ্যম তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করেই একপাক্ষিক সংবাদ প্রকাশ করেছে। যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, সেটিও অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। সাংবাদিকতার মূল শক্তি হলো সত্য অনুসন্ধান এবং সব

একজন উদ্যোক্তার আট মাসের শ্রম, কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং অসংখ্য কর্মীর জীবিকা যেন কোনো অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির কাছে জিম্মি না হয়ে যায়। একইভাবে কোনো সাধারণ ক্রেতার অভিযোগও যেন উপেক্ষিত না হয়।

ব্যবসা করতে হলে নিরাপত্তা দরকার। অভিযোগ জানাতে হলে আইনি পথ দরকার। সংবাদ প্রকাশ করতে হলে সত্য যাচাই দরকার। আর বিচার পেতে হলে দরকার আইনের শাসন।

আশিক খান কিংবা Live Shopping-এর এই ঘটনাটি তাই শুধু একটি শোরুমের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—

আমরা কি এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে অভিযোগের জবাব আইন দিয়ে নয়, দলবদ্ধ শক্তি দিয়ে দেওয়া হবে?

উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে এখনই সময়—অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও আবেগের বাইরে গিয়ে প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য উদঘাটন করার।

কারণ একটি স্বপ্নের শোরুম ভাঙা মানে শুধু কয়েকটি পণ্য হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন উদ্যোক্তার স্বপ্ন, ব্যাংকের ঋণ, কর্মীদের জীবিকা এবং একটি ব্যবসা দাঁড় করানোর দীর্ঘ সংগ্রাম।

আর সেই স্বপ্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একজন উদ্যোক্তার দায়িত্ব নয়—এটি আইনের শাসন, রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব।

এম. সুজন হোসাইন
            সম্পাদক ও প্রকাশক


মতামত দিন