কালো টাকা বৈধকরণের সুযোগ নিয়ে তীব্র সমালোচনায় সরকার।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করে নির্ধারিত হারে কর পরিশোধের মাধ্যমে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অঞ্চলভেদে এ ক্ষেত্রে করহার তিন থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এতে যে রাজস্ব আহরণের পরিবর্তে বিতর্কের রসদ জোগানো হয়েছে, সেটিই এখন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাজেট ঘোষণার পরপরই অর্থনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষণা সংস্থা ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি “জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাবিরোধী” হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, “এ ধরনের ব্যবস্থায় সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন।একই সঙ্গে এটা কর প্রশাসনের দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আরও কঠোর ভাষায় এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছে, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার মৌলিক বিরোধী। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অভিযোগ করেন, “সরকার মূলত রিয়েল এস্টেট লবির চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। এই ধরনের সুযোগ দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠিত ও পুরস্কৃত করে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার নিজেও এখন দ্বিধায় আছে। এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন,কালো টাকা বৈধকরণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্কের কারণে সরকার এ বিধান থেকে সরে আসতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠলে অর্থ উপদেষ্টা জানান, “সরকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।” এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান বলেন, “সরকার চূড়ান্তভাবে না চাইলে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা সম্ভব।”
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা না হলেও, সীমিত বিনিয়োগের মাধ্যমে তা বৈধ করার সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তার মতে, “সরকার যদি চায়,বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
তথ্য বলছে, অতীতে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়ে কোনো দীর্ঘমেয়াদি সুফল মেলেনি। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ কালো টাকা বৈধ করা হলেও, তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কঠোর শর্তসাপেক্ষে ছিল। পরে ২০২০-২১ অর্থবছরেও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অপ্রদর্শিত অর্থ বিভিন্ন বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈধ করা হয়। তবে সেগুলোর অধিকাংশই ছিল ব্যাংক আমানত, নগদ অর্থ বা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—জাতীয় বাজেটে কর নীতির নৈতিকতা কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে? কালো টাকা বৈধকরণ কি রাজস্ব বাড়ানোর যৌক্তিক পথ, নাকি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার আরেকটি সুযোগ?
মতামত দিন