অপরাধ
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেই আসতো আটক-হত্যার নির্দেশ, জানালেন সাবেক আইজি।

নিজেস্ব প্রতিবেদক:

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিচ্ছেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তিনি সাক্ষ্য দিতে বসেন।
মামলায় আসামি হিসেবে আছেন শেখ হাসিনা ও আরও দুজন।

সাবেক এই পুলিশপ্রধান জানান, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভোটের আগের রাতে অর্ধেক ব্যালট আগে থেকেই বাক্সে ঢুকিয়ে রাখার পরামর্শ দেন তৎকালীন আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী। এরপর যারা এই কাজ সম্পন্ন করে, তাদের অনেককে বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকেই পুলিশের ভেতর রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষত গোপালগঞ্জ অঞ্চলের কর্মকর্তারা প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এর ফলে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে ওঠে। এমনকি তার অবসরের সময় ২০২৩ সালে নির্ধারিত থাকলেও, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ঠেকাতে সরকার তাকে আইজিপি পদে অতিরিক্ত সময় বহাল রাখে।

র‍্যাবের কার্যক্রম নিয়ে তিনি বলেন, কাউকে আটক, অপহরণ কিংবা হত্যার নির্দেশ সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে আসত। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ও সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীর মাধ্যমে এ নির্দেশনা পৌঁছাতো। এ ধরনের অভিযানে র‍্যাব কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিন ও মহিউদ্দিন ফারুকি বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন।

জুলাই–আগস্টের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ১৯ জুলাই থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান কামালের বাসায় প্রায় প্রতিদিন রাত আট-নয়টার দিকে কোর কমিটির বৈঠক হতো, যেখানে তাকেও অংশ নিতে হতো।

সেই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিব জাহাঙ্গীর, অতিরিক্ত সচিব টিপু সুলতান ও রেজা মোস্তফা, এসবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদ, র‍্যাব মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুনুর রশিদ, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, বিজিবির ডিজি মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, আনসার মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ.কে.এম. আমিনুল হক, এনটিএমসির ডিজি মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং ডিজিএফআই প্রধান উপস্থিত থাকতেন বলে জানান তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বৈঠকে আন্দোলন মোকাবিলা ও দমনসহ সরকারের বিভিন্ন নির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হতো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্তও এমন এক বৈঠকেই নেওয়া হয়। এরপর ডিজিএফআই ও ডিবি প্রধান হারুনকে তাদের আটক করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আটকের পর তাদের ডিবি কার্যালয়ে মানসিক চাপ ও নানা ধরনের নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। আত্মীয়দেরও জিম্মি করে আন্দোলন প্রত্যাহারের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি টেলিভিশনে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয় সমন্বয়কদের।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার কার্যকর করা হয়।

ডিবি প্রধান হারুনের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিবিড় সম্পর্ক ছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকে মজা করে ‘জ্বিন’ নামে ডাকতেন। সরকারের নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়নে তার রাজনৈতিক আনুগত্য ও কার্যকারিতার কারণে মন্ত্রী তাকে বিশেষভাবে মূল্য দিতেন।

মতামত দিন